সাম্প্রতিক কাশ্মীরী ছো্টগল্প ( তৃতীয় এবং শেষ কিস্তি)

 

টিউলিপের বাগান, শিকারা আর ডাল লেক- বললেই কার কথা সবার আগে মনে পড়ে? হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন- এসব শুনলেই মনে পড়ে কাশ্মীরের কথা। আরো ভাল করে বলতে গেলে ভূস্বর্গ কাশ্মীরের কথা যেখানে একদিকে ভয়ঙ্কর, আরেকদিকে সুন্দর একদিকে সংঘর্ষের দামামা আর একদিকে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ পাহাড়ের হাতছানি কী অদ্ভুত বৈপরীত্য, না? আমরা সারাক্ষণ কাশ্মীর নিয়ে কাটাছেঁড়া করি, কাশ্মীরের অশান্তির জন্য ভারত দায়ী না পাকিস্তান দায়ী, তাই নিয়ে মতামত দিয়ে থাকি অহরহ কাশ্মীরের জনগণকে দোষ দিয়ে থাকি কিন্তু আমরা হয়তো কেবল কাশ্মীরের অশান্ত দিকটাই দেখতে পাই, কাশ্মীরের সাংস্কৃতিক দিক আমাদের নজরেই পড়ে না যেখানে রয়েছে কাশ্মীরী ছোটগল্প’-এর মতো মণিমুক্তো কাশ্মীরের প্রগতিবাদী আন্দোলন থেকেই জন্ম নিয়েছিল এই ছোটগল্প উর্দু গল্পলেখকেরা মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য আর জাতীয়তাবোধের তাগিদেই কাশ্মীরী ভাষায় ছোটগল্প লিখতে শুরু করেন। আর চারপাশের পরিবর্তিত মূল্যবোধ ও অনিশ্চয়তাকে লেখার মাধ্যমে সকলের সামনে তুলে ধরেছেন। সেইরকমই বিভিন্ন কাশ্মীরী লেখকের লেখা ১৭টি গল্প নিয়ে হৃদয় কউল ভারতী সংকলিত এবং পৃথ্বীশ সাহা অনূদিত ‘সাম্প্রতিক কাশ্মীরী ছোটগল্প’ নিয়ে আজ আমি কথা বলব।আজ আমি বলব এই সংকলনের শেষ ৫টি গল্প 

১) শূন্যতা(আলী মোহাম্মদ লোন)-

এই গল্পটা আমি বেশি বুঝতে পারিনি। তবে এটুকু বুঝেছি যে এটি একটি বুদ্ধিজীবীর গল্প, যিনি নিজের জীবনের কোন অস্তিত্বই খুঁজে পান না। না, এটা কিন্তু অস্তিত্বের সঙ্কটে ভোগা বা ডিপ্রেশন নয়। তিনি সচেতনভাবেই নিজের জীবনের বাঁধাধরা নিয়ম থেকে মুক্তি চান। সেই কারণেই অ্যাক্সিডেণ্টে বেশি চোট না পাওয়ায় আপশোস করেন, কারণ তিনি একটু বেশি চোট পেয়ে হাসপাতালে থাকার একটা ‘দুর্লভ অনুভূতি’ লাভ করার আশা করেছিলেন। নিজেকে একটি জড় পদার্থ ভেবেই তার সুখ। এই গল্পটি স্বগতোক্তির ঢঙে রচিত এবং এতে ওই একটিই চরিত্র আছে। আপাতদৃষ্টিতে চরিত্রটিকে একটু অপ্রকৃতিস্থ বলে মনে হলেও আসলে তার মনের মধ্যে একটি বিরাট শূন্যতা রয়েছে। লোকটি ক্রমাগত সেই শূন্যতাকে পূরণ করতে চেষ্টা করেন কিন্তু পারেন না। লেখক এখানে সুন্দরভাবে একজন বুদ্ধিজীবীর মনস্তত্ত্বকে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। একই সঙ্গে নতুন রকমের জীবনযাপনের চেষ্টা এবং অন্তরের সীমাহীন শূন্যতার সঙ্গে যুদ্ধ করা, লেখকের লেখনীতে ফুটে উঠেছে। এটা হয়তো আমাদের সমাজে থাকা অনেক মানুষেরই জীবনযুদ্ধ। লেখকের কৃতিত্ব এখানেই যে, গল্পের ট্যুইস্টটিকে একেবারে শেষে নিয়ে এসেছেন, যাতে চরিত্রটির প্রতি পাঠকের মনোভাব পালটে যায়। 

২) শ্বাস-প্রশ্বাস(ফারুক মাসুদি)-

এই গল্পটির মধ্যে একটি মানুষের মৃত্যুচিন্তা এবং আত্মহননের ইচ্ছা জড়িয়ে আছে। সে তার স্ত্রীকে খুন করেছে, নিজেও আত্মহননে উদ্যত। কিন্তু মায়ের কথা মনে করেই সে আত্মহত্যা করতে পারছে না। সে স্ত্রীকে কেন খুন করেছে গল্পে সেই কারণ স্পষ্ট নয়। গল্পটি  যেন হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে। গল্পটি কোনো সম্পূর্ণ ঘটনাও নয়। তাই এতে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। তবে গল্পটির সারপ্রাইজ এণ্ডিং ঘটেছে ছেলের কাছে মায়ের নিজেকে সঁপে দেওয়ার মতো চমকপ্রদ এবং অবিশ্বাস্য ঘটনার মধ্য দিয়ে। সারা গল্পটির মধ্যে একটি নৈরাশ্য খেলা করেছে যা লেখকের মুনশিয়ানার ফসল। তবে গল্পটির নামকরণের সঙ্গে গল্পটির সম্পর্ক আমার অস্পষ্ট বলেই মনে হয়েছে।

৩) বৃত্ত(নাসির মনসুর)-

গল্পটি একটি এমন মানুষের, যাকে একবার মনে হবে আত্মমগ্ন, আবার মনে হবে অসুস্থ। কিন্তু আরো একটু ভাল করে বিচার করলে দেখা যায়, সে কিন্তু একজন একনিষ্ঠ পাঠক বা সাদা বাংলায় বইপোকা, যার কাছে তার লাইব্রেরিটাই শ্রেষ্ঠ সম্পদ। গল্পে তার যে অ্যাপিয়ারেন্স দেখানো হয়েছে, তাতে লোকটিকে অপ্রকৃতিস্থও মনে হতে পারে। কিন্তু সে এই গড্ডলিকা প্রবাহে প্রবাহিত, কোলাহলপূর্ণ সমাজজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চায়, তার পুরোনো উজ্জ্বল সময়টাতে ফিরে যেতে চায়, এখনকার অবস্থা তাঁকে দুঃখ দেয়। সে শান্তিপ্রিয়, তাই নদীর ধার আর ঠাণ্ডা বাতাসেই তার মনের আরাম হয়। কিন্তু বাস্তবের কঠোর আঘাতে তাঁকে আবার ফিরে আসতে হয় এই বাস্তব জগতে। তার স্বপ্নের জায়গা যে কেবল মায়ামরীচিকা, ঘুম ভেঙে যাওয়ায় তা বুঝতে পারল। গল্পের চরিত্রটির প্রতি কাহিনির শুরুতে পাঠকের যে মনোভাব থাকবে, কাহিনির শেষে তা বদলে যাবে বলেই আমার ধারণা।  লোকটির প্রতি সহানুভূতিতে পাঠকের মন ভিজে যায়। আমাদের সমাজেও যে এমন মানুষ আছেন, যারা কিনা সমাজের চোখে পাগল ছাড়া আর কিছুই নয়, লেখক যেন সেই কথাই আরো একবার আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন।

৪) রোদ (হরিকৃষ্ণ কউল)- 

 এই গল্পটি এই সংকলনের অন্যতম মর্মস্পর্শী গল্প। কাশ্মীরের এক বৃদ্ধা পশিকুজ, যে কয়েকদিনের জন্য দিল্লিতে তার বড়লোক ছোটছেলের বাড়িতে থাকতে এসেছে। সে আদতে থাকে তার গরীব বড়ছেলে-বড়বউ আর নাতির সঙ্গে। দিল্লি এসে সে বিস্মিত হয় সেখানকার লোকজনদের দেখে। আর ছোটবউ ‘ছোটি’-র সঙ্গে অহরহ তুলনা করতে থাকে তার মুখরা বড়বউয়ের। কিন্তু সে একটা সময় বুঝতে পারে, সে যতই তার ছোটছেলের প্রশংসা করুক না কেন, তার মন পড়ে আছে তার বড়ছেলে, বিশেষ করে নাতি বিট্টুর কাছে। ছোটছেলে সাবার বৈভব তাঁকে বড়ছেলে গাসার দারিদ্র্যের জন্য কষ্ট দেয়। ওই যে, কথায় বলে না, মা তার সবচেয়ে দুর্বল সন্তানটির প্রতিই বেশি স্নেহময়ী। তাই সে বেশিদিন আর থাকতে পারে না। কিন্তু দিল্লির একটি জিনিস তার ভারি ভাল লাগে, সেটি হল সেখানকার শীতকালীন রোদ। নতুন জায়গায় আদবকায়দায় অভ্যস্ত না হওয়া, ছোটির কাছে বারবার অপ্রস্তুত হওয়া, ছেলের সামনে নিজেকে ছোট মনে করা, ইত্যাদি সব ব্যাপারকে পশিকুজ ভুলে যায় ওই রোদে বসে। রোদের ঊষ্ণতা তাঁকে যেমন জড়িয়ে রাখে, তেমনই নাতি বিট্টুর কথা ভাবিয়ে দুঃখ দেয়। সে বিট্টুকেও ওই শীতের রোদের আমেজ দিতে চায়। গল্পে একজন প্রাচীনপন্থী বৃদ্ধার নারী- মনস্তত্ত্ব খুব সুন্দরভাবে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। যে মনের হদিশ পাওয়া যায় পুত্রবধূদের মধ্যে তুলনায়, গরীব ও মুখরা পুত্রবধূর নিন্দায়, আধুনিকা ছোট পুত্রবধূর প্রশংসায় ও তার প্রতি গোপন ঈর্ষায়, ছেলেদের মধ্যে তুলনায়, নতুন শহরের নতুন আদবকায়দার প্রতি অবজ্ঞায়। পশিকুজ ছোটির তারিফ করে, কিন্তু তার প্রাচীনপন্থী মন আধুনিকা ছোটির আচরণে খুশি হয় না। আধুনিক পুত্র ও পুত্রবধূর কাছে হাসির পাত্র হবার ভয়ে সে হীনম্মন্যতায় ভোগে। গল্পটিতে প্রাচীন ও নবীনের দ্বন্দ্ব  খুব সূক্ষ্ম ভাবে ফুটে উঠেছে। এর সঙ্গেই ফুটে উঠেছে মানিয়ে নিতে না পারার অক্ষমতা, মায়ের স্নেহশীল মন। যেটা এই গল্পএ আমার সবচেয়ে চমকপ্রদ লেগেছে, সেটা হল, লেখক খুব নির্বিকারভাবেই পাঠকের দিকে একটি বড় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। দিল্লি আর কাশ্মীরের তুলনা করতে গিয়ে সে বলেছে, “ দিল্লির মুসলমানরাও কী কাশ্মীরি মুসলমানদের মতো আতঙ্কে দিন কাটায়?” এই প্রশ্নটি করার মাধ্যমেই কাশ্মীরের নিত্যনৈমিত্তিক অস্থির পরিস্থিতির একটা আভাস পাই আমরা। তার এই প্রশ্ন কিন্তু এখনকার সময়েও সমান প্রযোজ্য। চোখে লেগে থাকা আর মনে গেঁথে যাওয়ার মতোই প্রশ্ন করেছেন পশিকুজ, বকলমে লেখক। পশিকুজ আর জন্মভূমির টান অস্বীকার করতে পারে না। দিল্লির অনেক গুণগান করা সত্ত্বেও সে ফিরে যাওয়া মনস্থ করে, আর সঙ্গে নিতে চায় একমুঠো শীতের রোদ।

৫) সূর্য উঠবে না (হৃদয় কউল ভারতী)-

সত্যি বলতে কী, এই গল্পটির মর্মার্থ আমার একেবারে মাথার উপর দিয়ে গেছে। মানে, কিছুই বুঝতে পারিনি। একটি লোককে বাড়ি থেকে তিন চারজন রহস্যময় লোক হাসপাতালে নিয়ে গেল, সেখানে গিয়ে লোকটির দেহ বানরের দেহে রূপান্তরিত হতে লাগল। তার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোলো না। আর সেই লোকটি বুঝতে পারল যে, আগামীকালের সূর্য আর উঠবে না। এটিকে একটি রূপক গল্প বলেই মনে হয়েছে আমার। হয়তো এই গল্পটির মধ্য দিয়ে লেখক এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে মনুষ্যসমাজের অগ্রগতি না হলে তারা তাদের পূর্বরূপ বানরের মতোই প্রাচীনতার দিকে চলে যেতে থাকবে আর মানবসভ্যতার আশা-আকাঙ্ক্ষা, নতুন দিনের নতুন প্রাণের প্রতীক সেই সূর্য, আর উঠবে না, কারণ সূর্য অগ্রগতির প্রতীক। আর মানবসমাজ পশ্চাদগামী হতে থাকলে সেই সূর্য ধীরে ধীরে নিভে যাবে। তবে গল্পের রুদ্ধশ্বাস কথনভঙ্গি ও ফুটে ওঠা অসহায়তা আমার খুবই ভাল লেগেছে।

                                                                                  (শেষ)


Comments

Popular posts from this blog

ডি লা গ্র্যাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস- ইয়াক ইয়াক (শেষ কিস্তি)

ডি লা গ্র্যাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস- ইয়াক ইয়াক

সাম্প্রতিক কাশ্মীরী ছোটগল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)