সাম্প্রতিক কাশ্মীরী ছোটগল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)
টিউলিপের
বাগান, শিকারা আর ডাল লেক- বললেই কার কথা সবার আগে মনে পড়ে? হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন- এসব
শুনলেই মনে পড়ে কাশ্মীরের কথা। আরো ভাল করে বলতে গেলে ভূস্বর্গ কাশ্মীরের কথা। যেখানে একদিকে ভয়ঙ্কর, আরেকদিকে সুন্দর। একদিকে সংঘর্ষের দামামা
আর একদিকে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ পাহাড়ের হাতছানি। কী অদ্ভুত বৈপরীত্য, না? আমরা সারাক্ষণ কাশ্মীর নিয়ে কাটাছেঁড়া
করি, কাশ্মীরের অশান্তির জন্য ভারত দায়ী না পাকিস্তান দায়ী,
তাই নিয়ে মতামত দিয়ে থাকি। অহরহ কাশ্মীরের জনগণকে
দোষ দিয়ে থাকি। কিন্তু আমরা হয়তো কেবল কাশ্মীরের অশান্ত দিকটাই দেখতে পাই, কাশ্মীরের সাংস্কৃতিক দিক আমাদের নজরেই পড়ে না। যেখানে রয়েছে ‘কাশ্মীরী ছোটগল্প’-এর মতো মণিমুক্তো। কাশ্মীরের প্রগতিবাদী
আন্দোলন থেকেই জন্ম নিয়েছিল এই ছোটগল্প। উর্দু গল্পলেখকেরা মানুষের কাছে
পৌঁছানোর জন্য আর জাতীয়তাবোধের তাগিদেই কাশ্মীরী ভাষায় ছোটগল্প লিখতে শুরু করেন।
আর চারপাশের পরিবর্তিত মূল্যবোধ ও অনিশ্চয়তাকে লেখার মাধ্যমে সকলের সামনে তুলে
ধরেছেন। সেইরকমই বিভিন্ন কাশ্মীরী লেখকের লেখা ১৭টি গল্প নিয়ে হৃদয় কউল ভারতী
সংকলিত এবং পৃথ্বীশ সাহা অনূদিত ‘সাম্প্রতিক কাশ্মীরী ছোটগল্প’ নিয়ে আজ আমি কথা
বলব।আজ আমি বলব এই সংকলনের আরো ৫টি গল্প।
১) বেগম সাহেবার প্রশাসন (তাজ বেগম রেঞ্জু)-
এই গল্পটা পড়ে
আমার মাথা যেমন আগুন হয়ে উঠেছিল, তেমনই মন প্রশংসা
করেছিল গল্পটির লেখিকাকে। এই সংকলনের আমার অন্যতম পছন্দের গল্প এটি। একজন মানুষ যে কতটা
হৃদয়হীন, পরশ্রীকাতর,
সন্দেহপ্রবণ ও অহঙ্কারী হতে পারে, আর বিশেষ করে
সে যদি সমাজের উঁচুতলার মানুষ হয়, তাহলে সমাজের নীচুতলার মানুষদের
প্রতি কতটা অত্যাচারী হতে পারে, এই গল্পটি যেন তার জলজ্যান্ত
প্রমাণ। সরকারী আমলা বশির সাহেবের প্রভাবশালী স্ত্রী ‘বেগম সাহেবা’
তাঁর অধস্তনদের কীভাবে চালান, এবং কীভাবে ন্যায়বিচারের নামে এক ‘প্রহসন’-এ
অংশগ্রহণ করে বিচার করেন, এই গল্প তারই
কথা বলে। কাহিনি প্রথমেই শুরু হয়, একজন চাষীকে বেগমসাহেবার তিরস্কার করার মধ্য
দিয়ে। তারপর আসে নূরি নামে একটি মেয়ের
পালা, যে কিনা তার অমানুষ মদ্যপ স্বামীর ঘর করতে না পেরে তালাক (বিবাহবিচ্ছেদ)
নিয়েছে, কিন্তু বেগমসাহেবা তাকে বাধ্য করেন ওই স্বামীর ঘরে আবার ফিরে যেতে। নূরির বৃদ্ধ বাবা প্রতিবাদ করতে গিয়ে মার খায়। এরপর
বশির সাহেব আর বেগম সাহেবার কথোপকথনে উঠে আসে প্রতিবেশী সাবির সাহেবের প্রতি অবিশ্বাস,
সন্দেহ, ঘৃণা আর সেই সঙ্গে নিজেদের অপরাধগুলোকে ‘জাস্টিফাই’ করার চেষ্টা। লেখিকা
এক অদ্ভুত ক্ষমতাবলে বেগম সাহেবা চরিত্রটির প্রতি পাঠকের অপরিসীম ঘৃণা জাগরিত করতে
পেরেছেন। এছাড়াও কৃষিবিভাগের লোকেরা যেভাবে আমলা বশির সাহেব ও বেগমসাহেবার পদলেহন
করেছে তাতে সমাজের এই অন্ধকার দিকটি সহজেই ফুটে ওঠে। নূরি আর তার স্বামী সোবাহানের
কাহিনিতে ফুটে উঠেছে নারীর অসহায়তা ও অন্যায়ের প্রশ্রয়। আর চাষীটির প্রসঙ্গে তো
শ্রমিক মালিকের চিরন্তন দ্বন্দ্বই পরিস্ফুট। এই কাহিনি নিঃসন্দেহে সমাজের উঁচুতলার
মানুষদের প্রতি কশাঘাত।
২) এবার
কার পালা (শঙ্কর রাইনা)-
এই গল্পটিও
আমার অত্যন্ত পছন্দের গল্প। গল্পটির বিষয়বস্তুও গতানুগতিক নয়। হাসপাতালে অনেকদিন
ধরে ভর্তি থাকা মানুষদের উদ্দেশ্যে লেখা এই গল্প। তাঁদের দুঃখ, একঘেয়েমি, সুস্থতা
বা মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করা, তাঁদের অতীত জীবন, প্রেম সবকিছুর দলিল যেন এই
গল্পটি। সুস্থ হওয়ার, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অদম্য আকাঙ্ক্ষা এই গল্পের
চরিত্রগুলির মধ্যে প্রবল। তারা কেউ সমাজের উঁচুতলার মানুষ নয়, খুবই সাধারণ মানুষ।
আমা, গুলা, সালামা প্রমুখ এই সব রোগীদের সঙ্গে আবার জড়িয়ে আছে তাঁদের মাতৃসমা
সেবিকা সিস্টার রাজিয়া। এই গল্পটি কোন নির্দিষ্ট ঘটনা নয়, অতীত বর্তমান মিলিয়ে
কয়েকদিনের দিনপঞ্জি ও কয়েকজন মানুষের ভাবনা। রোগীরা সকলেই অল্পবয়স্ক যুবক বা তরুণ।
লেখক খুব বাস্তুবসম্মত ভাবেই তাঁদের মধ্যেকার সম্পর্কগুলো সাজিয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই পীড়িত
বলে একে অপরের প্রতি সদা বিরক্ত(কেবল আমা ছাড়া)। অথচ দীর্ঘদিন একসঙ্গে
থাকার জন্য তাঁদের পারস্পরিক নির্ভরতাও প্রবল। আমা-র চোখে ধরা পড়া
প্রত্যেকের সম্পর্কগুলো খুব সুন্দর। আমা-র চোখ দিয়ে সিস্টার রাজিয়ার হাসিমুখের আড়ালে
নিস্তরঙ্গ ও পীড়িত জীবনছবি, আমা-র প্রতি আকর্ষণ, সালামার প্রতি ভালোবাসা,
সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন লেখক। লেখক দেখাতে
সক্ষম হয়েছেন যে, অদম্য জীবনতৃষ্ণা থাকা সত্ত্বেও মৃত্যুর কাছে মানুষ কত অসহায়।
গুলা-র মৃত্যুতে শেষ হওয়া এই কাহিনি পাঠকমনে দুঃখ ও সহানুভূতি জাগিয়ে যায়। কাহিনির
মাঝে আমা-র প্রেমকাহিনি তাঁদের অন্তরের কষ্টকে পরিস্ফুট করে। আর গুলার জীবনপ্রদীপ
নিভে যাওয়ার সঙ্গে হাসপাতালের বাইরের একটি তুঁতে গাছের পাতা ঝরে যাওয়ার রূপকটি
অতুলনীয়।
৩) নতুন
ত্রিকোণ (রতন লাল শান্ত)-
আমরা সবাই
জানি, প্রেমের পরিণতি বিবাহে। কিন্তু প্রেম কী কেবল বিবাহেই সীমাবদ্ধ? বিবাহ না
টিকলে কী প্রেমও টেকে না? এই সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো পাওয়া যাবে সুরেন্দ্র-রতনির
এই কাহিনিতে। সাতবছরের সংসারে একসঙ্গে আর থাকতে পারে না সুরেন্দ্র আর রতনি। উভয়ের সম্মতিক্রমেই তারা
ডিভোর্স নেয়। নিজেদেরকে সম্পর্কের দায় থেকে মুক্ত ভেবে খুশি হয় তারা। কিন্তু
কাহিনি শুরু হয় তার পরে। তাদের পরিস্থিতি(নাকি অদৃশ্য পারস্পরিক টান?) নিজেদের
অজান্তেই তাদের একসঙ্গে থাকতে বাধ্য করে, পরস্পরের খোঁজ নিতে বাধ্য করে। তাদের
প্রতিদিনের এই রোজনামচার সাক্ষী থাকে তাদের বিশ্বাসী ভৃত্য দুনিচাঁদ। কিন্তু শেষ
অবধি তারা বুঝতে পারে যে, আলাদা হয়ে যাওয়া
সত্ত্বেও তাদের ভালোবাসা মরে যায়নি। সম্পর্কের দায় না থাকার জন্য বরং তা আরো পোক্ত
হয়েছে। নিরন্তর কলহের মধ্যেই তারা প্রেমকে খুঁজে পেয়েছে। সমাজে তারা ডিভোর্সী, মনে
মনে তারা স্বামী-স্ত্রী। এই গল্প বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানের একাধিপত্যকে অস্বীকার
করে চিরন্তন ভালোবাসার জয় ঘোষণা করে, যা প্রচলিত প্রেমের কাহিনি থেকে অনেকটাই
আলাদা। সুরেন্দ্র-রতনি তো বটেই, দুনিচাঁদের চরিত্রটিও খুব সুন্দর। মনিব দম্পতির
প্রতি নীরব ভালোবাসার প্রকাশে উজ্জ্বল সে। সুরেন্দ্র-রতনির সংসারের
ডিটেলিং ও খুব সুন্দর।
৪) হারানো জীবন(মোহন
লাল কউল)-
অপঘাত মৃত্যুর পরে,
প্রায় হঠাৎ করেই নিজের সযত্নলালিত পাঞ্চভৌতিক দেহটা থেকে বেরিয়ে গিয়ে কোনো মানুষের
ঠিক কেমন লাগে? তাই বলে আবার ভাববেন না যেন যে আমি পরলোকতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে বসেছি।
আমি ওসব নিয়ে না ভাবলেও এই যে গল্পটার কথা বলছি, সেই গল্পের নায়ক কিন্তু এসব ভাবছে,
বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করার ঠিক পরে!
সে নিজেই তার ছিন্নভিন্ন মৃতদেহটিকে দেখছে আর এও দেখছে, আশেপাশের মানুষজন কেউ
দেহটিকে সাহায্য করতে তো এগিয়ে আসছেই না, উপরন্তু পুলিশও কিছু করছে না। এই গল্পটি উত্তমপুরুষে এবং কিছুটা আত্মকথনের ভঙ্গিতে
রচিত। আসলে এই গল্পটির মধ্য দিয়ে কিন্তু আমাদের প্রতিদিনের জীবনের
একটি চরম সত্যকে লেখক তুলে ধরেছেন বলে আমার মনে হয়েছে। আজকাল শহরের ব্যস্ত রাস্তায়
হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা কয়জন ওই দুর্ঘটনাগ্রস্ত মানুষটির দিকে সাহায্যের হাত
বাড়িয়ে দিই? উলটে দুর্ঘটনাস্থলের ছবি ও আহত মানুষটির সঙ্গে সেলফি তোলার হিড়িক পড়ে
যায়। কারো কারো তো সেই সৌভাগ্যও হয়না। আহত হয়ে তিলে তিলে মৃত্যু হওয়ার পরই পুলিশ
বা পথচারীর ‘নজরে’ পড়েন তাঁরা। ঠিক যেমনটি হয়েছে এই গল্পের নায়কের সঙ্গে। লেখাটির
ছত্রে ছত্রে সদ্যমৃত মানুষটির এই দুঃখই ফুটে উঠেছে যে, তার মৃতদেহকে পড়ে থাকতে দেখেও
চারপাশের পরিবেশের কোনো পরিবর্তন ঘটল না। সে মৃত্যুর পর নিরপেক্ষভাবেই তার মৃত্যুর
জন্য দায়ী কারা, তার বিচারবিশ্লেষণ করতে বসলো। লেখক সত্যিই এক হারিয়ে ফেলা জীবনকেই তুলে ধরেছেন
এই রচনায়।
৫) বুকের তলায় গোরস্থান (শামস্-উদ্দীন
শামিম)-
এই গল্পটিও আমি খুব
একটা বুঝতে পারি নি, তবে এটুকু বুঝেছি যে, এটি জুন দেদ নামে একটি মেয়ের কাহিনি, যে
অসুস্থ অবস্থায় মৃত্যুর পরে নিজের ঘর ও প্রতিবেশীদের কীর্তি দেখছে। মেয়েটির সঙ্গী কেবল
তার চরকা, জাঁতাকল আর কুলো। জুনের মনে পড়ে তার বন্ধু খালেক জুয়ের কথা, নিজের নিস্তরঙ্গ
ও অস্বস্তিকর জীবনযাপনের কথা, নিজের অসুখ, হাসপাতালের স্নেহময়ী নার্স লাল দেদ প্রমুখের
কথা। প্রতিবেশীদের মিথ্যা সহানুভূতির কথাও তার মনে পড়ে। জুনের চোখ দিয়ে আমাদের এই সমাজের
একটুকরো চিত্রই লেখক আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। শব্দের বাঁধুনিতে সহায়হীন সহানুভূতিহীন
এক দমবন্ধ পরিবেশ সৃষ্টি করতে লেখক সুন্দরভাবে সফল হয়েছেন। চরকা, কুলো আর জাঁতাকল যেন
জুনের দুঃখময় জীবনের রূপক। রচনায় যে অল্প কয়েকটি চিত্রকল্প আছে, সেগুলি খুবই জীবন্ত।
লেখায় মাঝে মাঝে একটু অস্পষ্টতা থাকলেও সামগ্রিক কাহিনিটি মর্মস্পর্শী ।
( চলবে )
(পুনশ্চ- লেখাটা পড়ে কেমন লাগল কমেন্ট করে জানাবেন কিন্তু।)

Comments
Post a Comment