ডি লা গ্র্যাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস- ইয়াক ইয়াক (শেষ কিস্তি)
আজ আমি আবার শোনাব নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের
‘টেনিদা সমগ্র’ থেকে টেনিদার শেষ ১১টি গল্প। আর যারা আমার ব্লগ-এ নতুন, তাঁদের
জন্য বলি, এই গল্পগুলোর কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ গল্প টেনিদার
স্বকপোলকল্পিত, আর কিছু গল্প হল ঘটনার বিবরণ। আর টেনিদার বলা গল্পগুলো বেশির ভাগ
তৈরি হয়েছে চারমূর্তির আদত ঠেক-এ, অর্থাৎ চাটুজ্যেদের রকে। আর বাকি গল্পের জন্ম
অন্যান্য জায়গায়। কোনো কোনো গল্পে কিন্তু হাবুলের মুখে ঢাকাই ভাষা নয়, খাঁটি
চলিত ভাষাই রয়েছে। আর কিছু কিছু গল্প
টেনিদা বলেছে কেবল প্যালাকে আর অন্যান্য গল্পগুলো তিনজনকে একসাথেই বলেছে। আর হ্যাঁ, টেনিদার পেট থেকে গল্প বের করতে গেলে, ডালমুট,
তেলেভাজা অর্থাৎ কিছু খাদ্যদ্রব্য ভেট দিতে হয় বইকি। আরেকটা কথা বলে দিই যেটা আগের ব্লগে
বলি নি, সেটা হল প্রায় প্রতিটা গল্পেই টেনিদার কোনো
না কোনো মামার উদাহরণ চলেই আসে।আর হ্যাঁ, এই পর্বের গল্পগুলো
পড়ে আমার মনে হয়েছে যে, টেনিদা কিন্তু তার শাগরেদদের মধ্যে প্যালাকে
একটু বেশি ভালবাসে। অনেক কথা বলে ফেললাম। আর দেরি না করে
শুরুই করে দিচ্ছি।
১) ব্রহ্মবিকাশের
দন্তবিকাশ-
এই পৃথিবীতে
তো অনেকরকম স্বভাবের মানুষ থাকে। বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন স্বভাব। কিন্তু এমন
স্বভাবের মানুষেদের দেখা পেয়েছেন কী, যিনি মানুষকে আপ্যায়ন করে খেতে বসিয়েও খেতে
দেন না? উলটে বিচ্ছিরি রকমের হাসির কথা বলে মানুষকে বিষম খাইয়ে তো ছাড়েনই, সেই
সঙ্গে সব খাবারও চেঁছেপুছে খেয়ে নেন?
আমাদের টেনিদাদের পাড়ার ব্রহ্মবিকাশবাবু কিন্তু ঠিক সেইরকম একটি লোক। এই মারাত্মক রসিকতাগুলো
করে তিনি অনেককে ঘায়েল করেছেন। আমাদের টেনিদাকেও ঘায়েল করেছেন। কিন্তু মানুষটি তো
টেনিদা, তাই ও আর প্যালা কীভাবে এর একেবারে
‘নিদারুণ প্রতিশোধ’ নিয়েছে , সেটাই এর গল্পের বিষয়। ব্রহ্মবিকাশ যদি ওদের
হাসির গল্প বলে ঘায়েল করেন, তাহলে টেনিদা আর প্যালা ঘায়েল করেছে গ্লাসের ‘ম্যাজিক’
দেখিয়ে। আর দুহাতের উপরপিঠে কাঁচের গ্লাস
নিয়ে যুগপৎ ম্যাজিকের আশায় আর গ্লাসের মায়ায় বসে থাকা ব্রহ্মবিকাশবাবুকে বোকা
বানিয়ে সব খাবার খেয়ে নিয়েছে। কাহিনির শুরুতে বল্টুদা আর টেনিদার রেষারেষি খুব ভাল
লাগে। ব্রহ্মবিকাশবাবুর গল্প বলায় কায়দা পড়লে হাসি আসতে বাধ্য। আর টেনিদা-প্যালার
হাসির গল্প পড়ে কান্নাকাটির উদাহরণ তো দুর্দান্ত। চিমটি কেটে হাসি আটকানোর
বুদ্ধিটাও দারুণ।
২) টিকটিকির
ল্যাজ-
অনেকের
বিশ্বাস- ঠাকুরদেবতার স্বপ্নাদেশ, শেকড়বাকড় নিয়ে ইয়ার্কি নয়। কিন্তু আমাদের টেনিদা
ফুটবল ম্যাচ জেতার জন্য ‘বাবা কচুবনেশ্বর’( কোন দেবতা কে জানে!)-এর থানে
শেকড়বাকড়ের আশায় হত্যে দিয়ে শেষে একটা ‘টিকটিকির ল্যাজ’ ( আজ্ঞে হ্যাঁ) পেয়ে, বড্ড
আশাহত হয়েছিল। কিন্তু ওই টিকটিকির ল্যাজের যে কী মহিমা, সেটা ও বুঝতে পারে ম্যাচটা
হেরে যাওয়ার পরে। আসলে হয়েছিল কী, মনের দুঃখে ওই ল্যাজটা সে গুঁজে দিয়েছিল একটা নীল তাপ্পি মারা
প্যাণ্টের পকেটে। আর অদৃষ্টের কী ফের, সেই প্যাণ্টটা ছিল বিপক্ষ দলের গোলকিপার বিলটে ঘোষের। অতএব, আপনারা দুইয়ে দুইয়ে চার করে নিন। এর মাঝে আবার টেনিদা
বিলটের গায়ে পিঁপড়ের বাসা ছেড়ে দেওয়ার প্ল্যান করেছিল। কিন্তু ওই যে বললাম, সবই বাবা কচুবনেশ্বরের লীলা। নইলে কী আর টেনিদার
শাগরেদ ভেটকি ( না, না,
মাছ নয়) ভুল করে টেনিদাদের গোলকিপার প্যাঁচা
(এও কিন্তু পাখি নয়) –এর গায়ে পিঁপড়ে ছেড়ে দেয়!
তাই, কচুবনেশ্বরের কোপে সবই গেল। তবে টেনিদা এই গল্পে
বাবা কচুবনেশ্বরের কচু-ভোগের যা লিস্টি দিয়েছে,
অনেকেই বাড়িতে ট্রাই করতে পারেন। আর বাতাবি লেবু
স্পোর্টিং ক্লাব নামটাও যেমন দারুণ তেমনি দারুণ সেখানের প্লেয়ারদের নামগুলো। এতটাই
দারুণ যে ওগুলো মানুষের নাম কি না সন্দেহ হয়। সব মিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য গল্প।
৩) বেয়ারিং
ছাঁট-
চুল ছাঁটা
নিয়ে অনেকের অনেক রকম ব্যাপার থাকে। কিন্তু পয়সা খরচ না করে চুল ছেঁটে নিতে কে না
চায়। টেনিদার হাড়কিপ্টে জ্যাঠতুতো দাদা ভুলোদা, এমন বিনেপয়সায় চুল ছাঁটতে গিয়ে কেমন
শিক্ষা পেয়েছিল, সেটাই হল এই গল্পের বিষয়।
ক্যাবলার চুল ছাঁটার জন্য টেনিদা সঙ্গে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু ক্যাবলা সটান বারণ
করে দেওয়ায় ক্ষুণ্ণ টেনিদা এই গল্পটা শুনিয়েছিল। পশ্চিমে থাকার জন্য আর অবশ্যই পয়সা
বাঁচানোর জন্য পুরোপুরি দেহাতী হয়ে যাওয়া ভুলোদা নাপিতের স্বজাতি সেজে চুল কাটতে
গেলে নাপিত একদল লোককে দেখিয়ে বলে, অশৌচের কারণে ওদের সবার চুল কাটতে তার সঙ্গে
ভুলোদাকেও হাত লাগাতে হবে। এই দেখে ভুলোদা কেমন অজ্ঞান হওয়ার নাটক করেছিল, আর তাই
দেখে দেহাতী লোকেরা ভূতে ধরেছে ভেবে ওঝার কাছে নিয়ে গেলে ওঝা কেমন পিটুনি দিয়েছিল,
সেটা জানতে হলে গল্পটা পড়তেই হবে। আর
হাড়কিপ্টে মানুষের পয়সা বাঁচানোর উপর যে কটাক্ষ করা হয়েছে গল্পে, তা একেবারে
অনবদ্য। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে দেহাতী বুলি, আর টেনিদার বচনামৃতগুলো অপূর্ব।
৪) কাঁকড়াবিছে-
হ্যাঁ,
কাঁকড়াবিছেকে নিয়ে একদম চালাকি নয়। টেনিদার পচামামা ( ওর তো বিশ্বময় মামা!) একবার
একটা পাহাড়ি কাঁকড়াবিছের জন্য যেভাবে প্রাণে
বেঁচে গিয়েছিল, সেই গল্পই হল এটা।
ক্যাবলার একটা কাঁকড়াবিছে মেরে আনন্দ করার জবাবে টেনিদা এই গল্পটা চারমূর্তিকে
শুনিয়েছিল। টেনিদার সাতবার ম্যাট্রিকে ফেল
করা (বাপ রে!) পচামামাকে তার বাবা রেগে
বাড়ি থেকে দূর করে দেয়। পচামামা ভুটানে গিয়ে সেখানকার সবচেয়ে বড় কমলালেবুর বাগানের মালিকের কাছে
চালিয়াতি মেরে অরেঞ্জ স্কোয়াশ বানানোর চাকরি বাগালো। কিন্তু অরেঞ্জ স্কোয়াশের দৌলতে কেন পচামামাকে পালাতে
হল আর দুটো ভাড়া করা ভুটানি গুণ্ডা তাড়া করলে কীভাবে দুটো কাঁকড়াবিছের কামড়ের
দৌলতে সে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারল, সেটা জানতে গেলে অবশ্যই গল্পটা পড়তে হবে। তবে
গঁদের আঠা, পিঁপড়ের ডিম আর হোমিওপ্যাথিক ওষুধ যে
সেরা অরেঞ্জ স্কোয়াশ বানাতে কাজে লাগতে পারে, স্কোয়াশ খেয়ে যে মানুষ পাগল হতে পারে ,
চিতাবাঘের পিঠ টপকে, পাইথনের লেজ মাড়িয়ে আর শেয়ালকে ভয় পাইয়ে দিয়ে মানুষ দৌড়াতে
পারে আর সর্বোপরি কাঁকড়াবিছে যে কেক-বিস্কুট- ডিমভাজা খেয়ে নেয়, সেই আশ্চর্যজনক খবরগুলো একমাত্র এই গল্পেই
পাওয়া যায়। এছাড়া টেনিদার জবানিতে পচামামার বাড়ি কালীকৃষ্ণপুরে যাওয়ার রাস্তার
বর্ণনা অপূর্ব।
৫) হনোলুলুর মাকুদা-
এপর্যন্ত
টেনিদাকে যারাই ঠকিয়েছে, টেনিদা ঠিক তাঁদের সঙ্গে পাঙ্গা নিয়ে ফেলেছে। কিন্তু
হনোলুলুর মাকুদা ওরফে বেচারাম গড়গড়ি টেনিদা আর প্যালাকে যেমন ঠকিয়েছে, তেমনটি আর
কেউ পারেনি। আর মজার কথা হল, টেনিদা আর
প্যালা কিন্তু এই ঠকে যাওয়াটা ঘুণাক্ষরেও টের পায় নি। কীভাবে এই দুর্ধর্ষ ঠকানোটা
হল, তাই নিয়েই এই গল্প। নিজেকে ওয়ার্ল্ড ট্যুরিস্ট পরিচয় দিয়ে, দু-চারটে ভুলভাল বিদেশি
শব্দ বলে আর বাঙালীর অপমান করে ( আরো ভালো করে বললে টেনিদা আর প্যালার বাঙালী রক্ত
গরম করে দিয়ে) টেনিদা আর প্যালার গাঁটের কড়ি দিয়ে পেটপুরে খেয়ে মাকুদা ওদের নাকের
উপর দিয়ে চলে গেল। প্রথমে একটু বুঝতে পারলেও শেষে রাগের চোটে ঠকানোটা আর বুঝতে
পারেনি টেনিদা। গল্পশেষে দুজনকে বিশেষ করে টেনিদাকে বোকা হতে দেখে বেশ একটু ভালোই
লাগে। মাকুদার বিটকেল নামটা আর ভুলভাল জাপানি-ফরাসি-জার্মান শব্দগুলো তো অপূর্ব।
৬) হালখাতার খাওয়াদাওয়া-
নববর্ষ বা
হালখাতা মানেই হল এলাহি খাওয়াদাওয়া। সেই সময় সব দোকানেই কিছু না কিছু খাওয়ায়।
আমাদের টেনিদা আর প্যালা তাদের কুট্টিমামার হয়ে হালখাতা খেতে গিয়ে যে বিপদে
পড়েছিল, সেটাই হল গল্প। কুট্টিমামার কাছ থেকে হাতানো কার্ড নিয়ে টেনিদা আর প্যালা
গেছে নাসিকামোহন নস্য কোম্পানির (নস্যি কোম্পানির আদর্শ নাম একেবারে) কাছে
নেমন্তন্ন খেতে। কিন্তু ওরা তো আর জানে না, যে কুট্টিমামা তিন বছর ধরে ওই কোম্পানি
থেকে বাকিতে নস্যি কিনে একেবারে ওদের লালবাতি জ্বালিয়ে বসে আছেন। তাই কুট্টিমামার জন্য বরাদ্দ ধোলাইটা কোম্পানির
লোক টেনিদা আর প্যালাকেই ঘরে বন্দি করে দিতে যাচ্ছিল আর কি ! কিন্তু স্রেফ ভগবানের
দয়ায় ওই ঘরের জালনা ভাঙা থাকায় পিঠটান দিতে পারে দুজনে। গল্পের এই ‘আন এক্সপেক্টেড
ট্যুইস্ট’ টা দারুণ। আর ঘরবন্দি টেনিদা আর প্যালার কীর্তিকলাপ পড়লে বেশ থ্রিল আসে।
শেষ অবধি ওরা যে বাইরে বেরোতে পেরেছে, এতেই পাঠককুল খুশি। লাফ দিয়ে অবশ্য ওরা
ডাস্টবিনে পড়েছিল, কিন্তু তাতে কী?
৭) ঘুঁটেপাড়ার
সেই ম্যাচ-
খেলার মাঠে
লোকে কত কীই না করে! তবে খেলতে নেমে একাই বত্রিশটা গোল দিয়ে দেওয়ার মতো ক্ষমতা বোধহয়
সবার থাকে না, যেমনটা আছে আমাদের টেনিদার।
ঘুঁটেপাড়ার মোক্ষদা মাসির বাড়িতে ( আগে কিন্তু বলেছিল তেলিনীপাড়ায়) বেড়ানোর
সময় পাড়ার ছেলেদের ঝুলোঝুলিতে ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে মাঠে নেমে কীভাবে একাই বত্রিশটা
গোল দিয়েছিল টেনিদা, এটা তারই গল্প। বিপক্ষের জাঁদরেল প্লেয়ারদের পাল্লায় পড়ে ওরা
হেরেই যেত, যদি না আকাশভাঙা বৃষ্টি নামত, শিবতলার পুকুর ভেসে যেত আর তালগাছ থেকে
টপাটপ তাল পড়ত। আপনারা হয়তো ভাবছেন যে, পুকুর ভাসলে আর তাল
পড়লে খেলার কী? আরে ওতেই তো সব। পুকুর ভাসলো বলেই
মাছ উঠে এল, তার সঙ্গে যেই তাল পড়ল, সবাই মনের আনন্দে মাছ ধরতে আর তাল কুড়োতে লেগে
গেল। গ্রামের প্লেয়াররা তো বটেই, শহরের জাঁদরেল প্লেয়াররাও ওই রসে মজে গেল। আর সেই
ফাঁকে রেফারি টেনিদাকে পাকড়াও করে একাই বত্রিশটা গোল দিইয়ে নিলেন। আরো হয়তো নিতেন,
বাকিরা ফিরে আসায় আর হল না। টেনিদা যে চাল
মারছে, সেটা হাবুল বুঝেছিল বটে, কিন্তু টেনিদা শুনলে তো! আর টেনিদাকে গোল করতে
দেখে পাঠকেরা খুশি হলেও টেনিদা আদপে হয়নি, কেন? আরে, একটাও মাছ বা তাল পায়নি যে!
আলুভাজা বা গাজরের হালুয়ার মতো যে কারো মুখ হতে পারে, সেটা টেনিদা পড়লেই জানা যায়।
বিচালিগ্রামের স্লোগানের বিরুদ্ধে ঘুঁটেপাড়ার পাল্টা স্লোগান (হ্যাপ-হ্যাপ-
হ্যাররে আর থ্রি টিয়ার্স) ঘুঁটেপাড়া যাওয়ার পথে দু’মাইল দৌড়ানোর তার রহস্য,
আর টেনিদার মা নেংটিশ্বরী-স্মরণ অপূর্ব।
৮) টেনিদা
আর ইয়েতি-
ইয়েতি নিয়ে
তো এখন কতশত চর্চা। কিন্তু আমাদের টেনিদা যে গরমের ছুটিতে হিমালয়ান এক্সপিডিশনে গিয়ে
কালিম্পঙে একটা আস্ত ইয়েতি দেখে ফেলেছিল কপালজোরে, সেকথা কয়জন জানে? হাবুল-ক্যাবলা-প্যালা অবশ্য ধরতে পেরেছিল যে
টেনিদা চালিয়াতি করছে, কিন্তু সে কথা টেনিদাকে বলে কে? বলতে গেছে আর গাঁট্টা খেতে
খেতে বেঁচে গেছে। গল্পটা হল এই যে, টেনিদা
কুট্টিমামার ভায়রাভাই হরেকৃষ্ণবাবুর কালিম্পঙের বাড়িতে একজন ফরাসী ট্যুরিস্টের সঙ্গে
মজা করে নকল ইয়েতি দিয়ে ভয় দেখাতে গেলে আসল ইয়েতিই সবাইকে দেখা দিয়ে গেল। ইয়েতিরা নাকি অন্তর্যামী আর ওরা অদৃশ্য থাকে, টেনিদা নাকি
খুব ভাল ফরাসি ভাষা জানে ইত্যাদি টেনিদার এই আকাশচুম্বী চালিয়াতিগুলো পড়লে সত্যিই
অবাক হতে হয়। এই গল্পটা বলে টেনিদা কিন্তু তার শাগরেদদের একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ করে
ছেড়েছে। ইয়েতির চা খাওয়া আর বেড়াতে যাওয়া নিয়ে ক্যাবলার ঠাট্টা, আর মঁসিয়ে লেলেফাঁ-কে
টেনিদার ইয়েতির সাড়ে তিনদিন ঘুম আর জাগার বর্ণনা দেওয়া অনবদ্য। আর আসল ইয়েতির দেখা
পাওয়ার মুহূর্তটা আমার থ্রিলিং ই মনে হয়েছে।
আর গল্পের শেষে টেনিদা টিকটিকে ছোকরা ক্যাবলাকে যেমন ঘাবড়ে দিয়েছে, তা
সত্যি দারুণ।
৯) একাদশীর
রাঁচি যাত্রা-
আচ্ছা, কখনও
এমন হাড়কিপ্টে মানুষ দেখেছেন, যার নাম নিলে সারাদিন খাবার জুটবেনা ভেবে লোকে তাঁকে
একাদশী বলে? টেনিদার এক বহুদূর সম্পর্কের পিসেমশাই হলেন সেই রকম এক ব্যক্তি। সেই পিসেমশাই কীভাবে
পাগল হয়ে রাঁচির পাগলাগারদে স্থান পেলেন, সেটাই হল গল্প। বড়লোক হয়েও শুকনো রুটি আর
বাটিচচ্চড়ি খাওয়া, শিঙিমাছের ল্যাজ ‘আধ ইঞ্চির কুড়ি ভাগের এক ভাগ’ কেটে সেই
ল্যাজের ঝোল বানিয়ে খাওয়া ইত্যাদি নিয়ে, কৃপণ মানুষদের প্রতি লেখক যে কটাক্ষ
করেছেন, তা অনবদ্য। এই গল্পটা কিন্তু
প্যালাকেই একমাত্র শুনিয়েছে টেনিদা। তবে পিসেকে লুকিয়ে পিসিমার পেটভরে খাওয়া, আর
পিসের জেরার মুখে মাথা ঠাণ্ডা করা জবাব দেখলে পিসিমাকে বাহবা দিতেই হয়। রান্নার
জন্য আগুনে হাঁড়ি ডেকচি পোড়ার শোকে পিসেকে পাগল হতে দেখে হাসিও পায়, করুণাও হয়। এই
পাগল হওয়ার জন্যই তো রাঁচি পিসের ঠিকানা হয়ে গেল। আর ভাগ্যিস প্যালা বুদ্ধি করে
তেলেভাজা কিনে এনে টেনিদার মেজাজ ঠিক করেছে, নইলে তো গল্পটাই শোনা হত না।
১০) ন্যাংচাদার
হাহাকার-
না, না, নাম
শুনে ভাববেন না যেন, আমি কোন দুঃখের গল্প বলছি। এর নামটা যতটা দুঃখের, গল্পটা
ততটাই হাসির। টেনিদার ন্যাংচাদা ফিল্মে পার্ট করার আশায় ফিল্ম স্টুডিওতে যাওয়ার
বদলে পাগলাগারদে পৌছে গিয়ে সেখানকার পাগলদের হাতে কেমন জব্দ হল, এটা তারই গল্প। ফিল্মে নামার অদম্য ইচ্ছে পোষণ করা ন্যাংচাদা খাবারের দোকানে গিয়ে দৈবাৎ দেখা পেল
‘হাহাকার’ ফিল্মের সহকারী পরিচালক চন্দ্রবদন চম্পটীর। তাঁকে পটিয়ে
ফিল্মে কাজ পাওয়ার কথাটা পাকা করে ফেলে সে। কিন্তু পথের নির্দেশমতো পৌঁছাতে গিয়ে
উঁচু পাঁচিল আর এল-ইউ-এম (-লাম) কথাটাকে ফিল্মের বানানের অংশ ধরে নিয়ে এসে পড়লো পাগলাগারদে। সেখানে ওর গ্র্যাণ্ড
ওয়েলকামটা যেভাবে হল, সেটা সত্যিই অনবদ্য। গান গেয়ে, ডোবায় পড়ে একেবারে জবরদস্ত
ফিল্মের পার্ট করেছে ন্যাংচাদা। কিন্তু
এতে তার ফিল্মে পার্ট করার শখ একেবারে মিটে গেছে। টেনিদার নীতিবাক্যটাও দারুণ,
সেটা হল- ফিল্মে পার্ট করা খুব ভয়ানক কাজ, ওসব করতে গেলে ন্যাংচাদার মতো হালই হবে।
১১) ভজগৌরাঙ্গ
কথা-
কিপটে লোক কতপ্রকারের হয়, তার যেন আর শেষ নেই।
কিন্তু যে লোকে পিঁপড়ে চিনি খেয়ে গেলে সেই পিঁপড়েগুলোকে দিয়েই চা করে খায়, তাঁকে
নিশ্চয়ই সেরা কিপটের শিরোপা দেওয়া যায়। টেনিদাদের পাড়ার ভজগৌরাঙ্গ সমাদ্দারই হলেন সেই
লোক। এই ভজগৌরাঙ্গ সমাদ্দারকে টেনিদা ইলেকট্রিকের তার চুরির অপরাধে নিশ্চিত জেল
যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে পোলাও মাংস খাওয়ানোর অঙ্গীকার করিয়ে নেয়। কিন্তু
ভজগৌরাঙ্গ, সেই অঙ্গীকার কাটাতে চাইলে দৈববিপাকে কেমন জব্দ হন, সেটা নিয়েই এই
গল্প। এই গল্পে কিন্তু ক্যাবলা আর হাবুল নেই। টেনিদা আর প্যালার চোঙা নিয়ে
ভজগৌরাঙ্গবাবুর কীর্তি ফাঁস করে বেড়ানোর কায়দাটা দারুণ। আর নিজের খাওয়ানোর খরচ
বাঁচাতে ভজগৌরাঙ্গ যে টাকায় যে খাবার খাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন তা হাস্যকরই। পুঁটিমাছভাজা আর পান্তাভাত যে ভালমন্দ খাবারের আওতায় পড়ে,
সেটা সত্যিই জানতাম না। কিন্তু টেনিদা আর প্যালা যে বুদ্ধি করে ভজগৌরাঙ্গবাবুর ছেলের
পাঠানো মিষ্টি নিয়ে কেটে পড়ে প্রতিশোধ নিয়েছে, সেটা ভালো হয়েছে। আর হাড়কিপ্টে
ভজগৌরাঙ্গবাবুকে নাজেহাল হতে দেখে অন্যান্য পাঠকদের মতো আমিও খুব খুশি হয়েছি।
(শেষ)
পুনশ্চ-
লেখাটা পড়ে কেমন লাগল কমেন্ট করে জানাবেন কিন্তু।
Comments
Post a Comment