সাম্প্রতিক কাশ্মীরী ছোটগল্প
টিউলিপের বাগান, শিকারা আর ডাল লেক- বললেই কার কথা সবার আগে মনে পড়ে? হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন- এসব শুনলেই মনে পড়ে কাশ্মীরের কথা। আরো ভাল করে বলতে গেলে ভূস্বর্গ কাশ্মীরের কথা। যেখানে একদিকে ভয়ঙ্কর, আরেকদিকে সুন্দর। একদিকে সংঘর্ষের দামামা আর একদিকে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ পাহাড়ের হাতছানি। কী অদ্ভুত বৈপরীত্য, না? আমরা সারাক্ষণ কাশ্মীর নিয়ে কাটাছেঁড়া করি, কাশ্মীরের অশান্তির জন্য ভারত দায়ী না পাকিস্তান দায়ী, তাই নিয়ে মতামত দিয়ে থাকি। অহরহ কাশ্মীরের জনগণকে দোষ দিয়ে থাকি। কিন্তু আমরা হয়তো কেবল কাশ্মীরের অশান্ত দিকটাই দেখতে পাই, কাশ্মীরের সাংস্কৃতিক দিক আমাদের নজরেই পড়ে না। যেখানে রয়েছে ‘কাশ্মীরী ছোটগল্প’-এর মতো মণিমুক্তো। কাশ্মীরের প্রগতিবাদী আন্দোলন থেকেই জন্ম নিয়েছিল এই ছোটগল্প। উর্দু গল্পলেখকেরা মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য আর জাতীয়তাবোধের তাগিদেই কাশ্মীরী ভাষায় ছোটগল্প লিখতে শুরু করেন। আর চারপাশের পরিবর্তিত মূল্যবোধ ও অনিশ্চয়তাকে লেখার মাধ্যমে সকলের সামনে তুলে ধরেছেন। সেইরকমই বিভিন্ন কাশ্মীরী লেখকের লেখা ১৭টি গল্প নিয়ে হৃদয় কউল ভারতী সংকলিত এবং পৃথ্বীশ সাহা অনূদিত ‘সাম্প্রতিক কাশ্মীরী ছোটগল্প’ নিয়ে আজ আমি কথা বলব। আজ বলব প্রথম ৭টি গল্পের কথা।
১) মায়াজাল (আখতার মহীউদ্দীন)-
একটি লোক এবং তাঁর মনোরোগী প্রেমিকার কাহিনি এই গল্পটি। প্রেমিকা মনোরোগী হয়ে
তাকেই আর সহ্য করতে পারে না। অথচ সেই লোকটি তাঁর প্রেমিকার জন্য নিবেদিতপ্রাণ।
প্রেমিকার দেখা পেতে সে ওই হাসপাতালের কম্পাউণ্ডারের পোশাক পরে নেয়। কিন্তু ওই
পোশাকটাই ওর পরিচয় হয়ে ওঠে। তাঁর প্রেমিকাও তাঁকে
প্রেমিক হিসেবে নয়, কম্পাউণ্ডার হিসেবে দেখেই খুশি হত। শেষে হাসপাতালের এক
নার্সের কথায় লোকটি বুঝতে পারে যে, ঐ কম্পাউণ্ডারের পোশাকটাই তাঁর অস্তিত্ব। এর
বাইরে আর কোনো অস্তিত্ব তাঁর নেই। তাই প্রেমিকার তাঁকে চিনতে পারা, নার্সের তাঁর
প্রতি আকৃষ্ট হওয়া, সবকিছুই মায়াজাল বলে মনে হয় তাঁর। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওই
পোশাকটা সে খুলতে চায় না। কারণ দুটি পৃথক অস্তিত্বের সংকটে ভোগা সত্ত্বেও সে নতুন
পরিচয়ের স্বাদ পায়। লেখকের লিখনভঙ্গি সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রেমিকার রূপবর্ণনায়
ব্যবহৃত উপমাগুলিও জীবন্ত। আর যুবতী
নার্সকে দেখে নিবেদিতপ্রাণ প্রেমিক হওয়া সত্ত্বেও চঞ্চল হওয়া এবং তাঁকে কামনা করা,
তারপর নার্সের কাছ থেকেও রূঢ় সত্য শোনা, কাহিনির ট্যুইস্ট এখানেই।
২) মোরগ লড়াই( আমিন কামিল)-
মানুষের মন কত অদ্ভুত,
তাই না? ঠিক যেমন অদ্ভুত এই গল্পের চরিত্র শাহমল
বেগমের মন। প্রতিবেশী প্যাংলা জনি (এমন নাম কেন কে জানে?)–র প্রতি তাঁর
বিদ্বেষ চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে সে বেছে নেয় নিজের পোষা মোরগটিকে। কারণ তাঁর ধারণা, জনি তার নিজের মোরগটিকে দিয়ে
শাহমলকে অপমান করতে চাইছে। তাই নিজের মোরগের উপরেই তার মানসম্মান নির্ভর করে। তার
মোরগটি জনির মোরগের কাছে হেরে গেলে সে বিরক্ত হয়ে সেটিকে মেরে ফেলার কথাও ভাবে।
তারপর কসাইয়ের সঙ্গে কথা বলে আসার পথে সে তার এবং জনির মোরগটিকে লড়াই করতে দেখে। সে
অবাক হয়ে তাঁর মোরগটিকে চূড়ান্ত দুর্দশা সত্ত্বেও জনির মোরগটিকে তাড়িয়ে দিতে দেখে,
আর জনির অপমানিত মুখটাও দেখে। সে শেষপর্যন্ত খুশি হয় এটা দেখে যে তাঁর মোরগটার
হিম্মত আছে, যা জনির মোরগটার নেই। লেখক খুব সুন্দরভাবে একটি মোরগকে সামনে রেখে
নারী মনস্তত্ত্বকে বুঝিয়েছেন। মানুষের ঈর্ষান্বিত মনের ছবিও খুব সুন্দর লাগে জনির
মধ্য দিয়ে। মোরগ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে দুটি মানুষের প্রতিযোগিতাকে এভাবে তুলে ধরার
জন্য লেখক ধন্যবাদার্হ।
৩) জ্বলন্ত চক্ষু (অবতার কৃষ্ণ রেহবার)-
এটি এক ক্যানসার রোগীর কাহিনি। সে রোগযন্ত্রণায় কাতর হয়ে একজোড়া চোখ দেখতে
পায়। সেই চোখ ছিল তাঁর একসময়ের প্রেমিকার চোখ। যেন তাঁকে অতীতের কষ্টকর স্মৃতিতে
ফিরিয়ে নিয়ে যায়। কেমন ভাবে সে প্রেমিকার
জন্য বিভোর হয়ে থাকত, তারপর এক দুর্ঘটনায় তাঁর পা কাটা যাওয়ার পর কীভাবে তাঁর প্রেমিকার
আসল রূপটি তাঁর সামনে প্রকাশিত হল, তাঁর
প্রেমিকা যে কেবল তাঁর শরীরটাকেই ভালবাসেন, মনকে নয়, তা লোকটি বুঝতে পারল। কিন্তু ওই চোখদুটিকে ঘৃণা করা সত্ত্বেও প্রেমিকার
মায়াময় চোখের আবর্ত থেকে সে বেরোতে পারলো না। ক্যানসারের কষ্ট আর
চোখের আবর্ত তাঁকে আমৃত্যু যন্ত্রণা দিতে থাকে। লেখক খুব সুন্দরভাবে
সমগ্র গল্পটির মধ্যে একটি দমবন্ধ যন্ত্রণার পরিবেশ এনেছেন। উত্তমপুরুষে লেখা গল্পটি
যেন একটি মানুষের অন্তর্নিহিত যন্ত্রণাকে পরিস্ফুট করেছে।
৪) দগ্ধ সূর্য (আনিস হামাদানি)-
সত্যি কথা বলতে, আমি এই গল্পটা ঠিক বুঝতে পারিনি। কিন্তু যেটুকু বুঝেছি
সেটুকুই বলছি। এটা হল এমন এক মানুষের গল্প, যাকে পাগল সাজিয়ে দীর্ঘদিন একটি সেলে
রেখে দেওয়া হয়েছে। কাহিনির সারমর্ম হল, লোকটি বলছে যে তাঁকে একদল লোক নিয়ে গিয়ে
তাঁর চোখদুটি সুদ্ধ মুখের অংশ দুটুকরো করে কেটে ফেলে (কী ভয়ানক!) তারপর এতদিন
বন্দি থাকা সেই লোকটিকে তারা ছেড়ে দেয়। এটি একটি রূপক গল্প বলেই আমার মনে হয়েছে।
আর সমগ্র লেখার মধ্যে যেভাবে একটা রহস্যময় দমবন্ধ করা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে,
সেটা সত্যিই অতুলনীয়। শব্দগুলির মাধ্যমে যেন পরপর ছবি পাঠকের সামনে ফুটে ওঠে। গল্পের ক্লাইম্যাক্স অর্থাৎ মুখ কেটে ফেলার
ঘটনাটি এতই নিরাসক্ত ভাবে আর সাদামাটা ভাবে বলা হয়েছে যে তা পাঠককে হঠাৎ করেই চকিত
করবে।
৫) প্রবাহ (ইকবাল ফাহিম)-
এই গল্পটাও আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। তবে আমার মনে হয়েছে, এটা একটি মানুষের
অন্তরসত্তার গল্প। সে নিজেকে এবং অন্য মানুষকে দেখে জীবনের গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে
যেতে। তাঁদের কোনো প্রাণ নেই, জন্ম থেকে মৃত্যু তারা এই প্রবাহেই কাটায়। সে এমন এক
মানুষের দেখা পায়, যার অবস্থান এই প্রবাহের বাইরে। সে তাঁকে এই আবর্ত থেকে বেরোনোর
রাস্তা জিজ্ঞাসা করে। কাহিনিটির কিছু কিছু জায়গা আমার দুর্বোধ্য মনে হয়েছে। এটিও
একটি রূপক গল্প বলে মনে হয়েছে আমার। জীবনের প্রবাহকে এখানে লাল জলের সঙ্গে তুলনা
করা হয়েছে।
৬) লাভ ম্যারেজ (বংশী নির্দোষ)-
কী ভাবছেন, এটি একটি খুব সুন্দর প্রেমের গল্প, তাই তো! একদমই নয়। আসলে এটি একটি
খুব সুন্দর প্রেমে ধোঁকা খাওয়ার গল্প। লেখক যে সময়ের কথা বলেছেন, সে সময়ে দুজন
অবিবাহিত নারীপুরুষ তো দূর, বিয়ে করে সন্তানের পিতামাতা হয়ে যাওয়া স্বামী-স্ত্রীরও স্বাভাবিক প্রেম দোষাবহ ছিল। এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে গল্পের
কথক গল্পের অন্যতম চরিত্র কর্মস্থল থেকে গ্রামে বেড়াতে আসা কুদর্শন ‘থোণ্ডা’ (কী অদ্ভুত নাম!)-কে পরমাসুন্দরী মেয়ে ‘মহারাজা’-র সঙ্গে প্রেম করতে উৎসাহ দিচ্ছেন। মহারাজা একটি লাস্যময়ী
মেয়ে, যার রূপের সাগরে কথক হাবুডুবু খাচ্ছেন,
কিন্তু নেহাত স্ত্রী সন্তান আছে বলে কোন সম্পর্কে যেতে পারছেন না,
কেবল বারান্দা থেকে দেখেই নিরস্ত হচ্ছেন। আর মহারাজাও খুব উপভোগ
করে এই দেখা। কথকও থোণ্ডাকে ওই একই পদ্ধতিতে মহারাজার সঙ্গে প্রেম করার পরামর্শ
দেন। এবং স্থির করেন যে, থোণ্ডাই মহারাজার উপযুক্ত
পাত্র। সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু লেখককে সাংঘাতিক রকম চমকে দিয়ে মহারাজার বিয়ে ঠিক হয়ে যায় থোণ্ডারই বুড়ো বাবা কেশবনাথের
সঙ্গে, থোণ্ডাও গুটিগুটি চলে যায় তাঁর কর্মস্থল হিসারে। মহারাজার সঙ্গে
থোণ্ডার প্রেমের স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। গল্পের ট্যুইস্ট একেবারে
শেষ লাইনে। কিন্তু ট্যুইস্টটি একটু আকস্মিক। আর কথকের সুন্দরী মহারাজার স্বামী হিসেবে
থোণ্ডার কথাই কেন মনে হল, সেটা গল্পে স্পষ্ট নয়। কিন্তু মহারাজার সাজপোশাক ক্রমশ আধুনিক
হয়ে ঊঠছিল আর থোণ্ডা যে একটু বেশিই স্থির হয়ে
যাচ্ছিল, সে কথা জানিয়ে লেখক আমাদের কৌতূহল
বাড়িয়ে দিয়েছেন।
৭) দৃশ্যরূপ (বশির আখতার)-
এই গল্পটাও যদিও আমি তেমন ভাল বুঝতে পারিনি, কিন্তু এটুকু বুঝেছি যে, এই
গল্পটি কয়েকটি ঘটনার সমাহার যেগুলো ঈশ্বর এবং কথক দুজনেই চোখের সামনে দেখছেন। ঘটনা
দেখে ঈশ্বর স্মিত হাসছেন আর কথক তাঁর ক্যামেরার সাহায্যে এই সব ঘটনাবলির একটি করে
ফটো তুলে নিচ্ছেন। গল্পে চারটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে- প্রথমত পিতাপুত্রের কাহিনি,
দ্বিতীয়ত লেখকের বাড়ির অনুষ্ঠানের কাহিনি, তৃতীয়ত এই উদ্ধত সাহেবের কাহিনি আর
চতুর্থত একটি রাগী লোকের কাহিনি। আমার পড়ে যা মনে হয়েছে, তা হল, একজন মানুষ যা
করে, তা অন্য কোনো মানুষের চোখে স্বাভাবিক মনে হলেও ঈশ্বরের চোখে সত্যিটা ধরা পড়ে
যায়। তাই তিনি হাসেন। আর যিনি ছবি তুলতে ভালোবাসেন তিনি প্রতিটি মুহূর্তকে
ক্যামেরাবন্দি করে রাখতে চান। তাই এই সব ঘটনাকে স্মরণীয় মনে করে তিনি সেই সব ঘটনা ক্যামেরাবন্দি
করে রাখছেন। গল্পের লিখনভঙ্গি অত্যন্ত বাস্তবানুগ। চারটি ঘটনা আলাদা হলেও সূক্ষ্ম
পারম্পর্য বিদ্যমান।

Comments
Post a Comment