ডি-লা গ্র্যাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস- ইয়াক ইয়াক ( চতুর্থ কিস্তি)
আজকের ব্লগ লেখাটা শুরু করার আগে কয়েকটা সোজা প্রশ্ন করা যাক। দার্জিলিং জায়গাটা কেমন লাগে? টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখেছেন কখনও? আর ম্যালে গিয়ে ঘোড়ায় কয়জন চড়েছেন? আর হ্যাঁ, কাঞ্চনজঙ্ঘা কেমন লাগে? না, না, রাগ করবেন না, আমি জেরা করছি না কিন্তু। শুধু জিজ্ঞেস করছি। আসলে দার্জিলিং আমরা প্রায় প্রত্যেকেই গেছি। টাইগার হিলের সূর্যোদয়, কাঞ্চনজঙ্ঘা সবই দেখেছি। কিন্তু এবার একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করি। যত যাই দেখি, মানুষের মুখে সবুজ রঙের দাড়ি কী দেখতে পেয়েছি কখনও?
আজ্ঞে হ্যাঁ, আজকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘টেনিদা সমগ্র’ থেকে যে উপন্যাসটা নিয়ে কথা বলব, সেটির নাম ‘ঝাউবাংলোর রহস্য’। রহস্য- রোমাঞ্চ আর হাস্যরসের পারফেক্ট মিশ্রণ হিসেবে এই উপন্যাসটি অনবদ্য। চারমূর্তি গরমের ছুটিতে দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে একেবারে বই থেকে উঠে আসা যে রহস্যের মুখোমুখি হয়, তাই নিয়েই এই উপন্যাস। এবার ওদের সঙ্গে কতগুলো ইন্টারেস্টিং চরিত্র ঘোরাফেরা করেছে এই উপন্যাসে, যেমন- সাতকড়ি সাঁতরা ওরফে পুণ্ডরীক কুণ্ডু, কদম্ব পাকড়াশি, জনৈক ঝুমুরলাল চৌবে চক্রবর্তী, জাপানি বিজ্ঞানী কাগামাছি( কী নাম!) আর কাঞ্ছা চাকর। তবে রহস্যের লীলাভূমি কিন্তু দার্জিলিং নয়, দার্জিলিং থেকে দূরে নীলপাহাড়ি নামে একটা জায়গায়। আরো ভালো করে বললে নীলপাহাড়ির ঝাউবাংলো নামে একটি বাংলোয়। প্যালার বর্ণনার জাদুতে দার্জিলিং আর তার আশেপাশের পরিবেশটা যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অর্থাৎ মানসভ্রমণ করতে কোন অসুবিধা হয় না। হয়তো দার্জিলিং-এর আমেজেই চারমূর্তির ছুটি কেটে যেতো, কিন্তু বাদ সাধল একটি চিরকুট। চিরকুটের অদ্ভুত ধাঁধা আর সাতকড়ি সাঁতরার আমন্ত্রণ তাদের টেনে নিয়ে গেল নীলপাহাড়ির রহস্যভরা ঝাউবাংলোয়। সাতকড়ি সাঁতরার কবিতায় ‘পাইন’ এর সঙ্গে মিলিয়ে ‘ফাইন’ দেখে মন ভরে যায়। আর সেই যে সবুজ দাড়ির কথা বলেছিলাম? আজ্ঞে হ্যাঁ, ওটা শ্রীযুক্ত সাতকড়ি সাঁতরারই দাড়ি (পরে অবশ্য জানা গিয়েছিল যে দাড়িটা নকল!) প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দাড়িকে সবুজ রঙে রাঙানোর উদাহরণ একমাত্র সাতকড়ি সাঁতরাই হতে পারেন। সংকেত হিসেবে ছুঁচোবাজি ছোড়ার বুদ্ধিটা দারুণ। আর সাতকড়িবাবুর মতো থিয়োরি অফ রিলেটিভিটির সঙ্গে অ্যাকোয়া টাইকোটিস বা জোয়ানের আরক মিশিয়ে ফর্মুলা তৈরি করতে কয়জন বিজ্ঞানী পেরেছেন?(আমার তো মনে হয় কেউ পারেননি)। জাপানি বিজ্ঞানী কাগামাছির সেই ফর্মুলার পিছনে ছুটে বেড়ানোর কাহিনি সাসপেন্সকে আরো জমাট করে। আর কাহিনির ফাঁকে ফাঁকে কাব্যের মাধুরী ও রহস্যের আমেজ আনতে সাতকড়িবাবুর অভিনব কবিতা আর ঝুমুরলালের থ্রেটসম্বলিত ছোট ছোট চিরকুট আর চকলেটের জুড়ি নেই। তবে উপন্যাসে সবচেয়ে দমচাপা সাসপেন্স বোধহয় লুকিয়ে আছে ঝাঊবাংলোয় চারমূর্তির কাটানো প্রথম রাতের মধ্যে। কাটামুণ্ডুর নাচ, আচমকা হাঁড়িচাচা পাখির ডাক, প্রোজেক্টরে হঠাৎ ছবির প্লে, দুম করে বাইরে থেকে ঘরের দরজা লক হয়ে যাওয়া- কোন হরর ফিল্মের থেকে কম নয়( অন্তত আমার তো তাই মনে হয়েছে! ওটা পড়ার পর রাতের ঘুম আনতে আমাকে বড্ড বেগ পেতে হয়েছিল।)
আর তারপরেই শুরু হয় আসল রহস্য, মানে সাতকড়ি
গায়েব হওয়ার পর। তবে একথা মানতেই হবে, পড়াকু ছেলে ক্যাবলা যতই গোয়েন্দা গল্পকে
বোগাস বলুক, ও কিন্তু বুদ্ধির জোরেই একজন বড় গোয়েন্দা হতে পারতো। তবে এই উপন্যাসে
চারমূর্তির টিম ওয়ার্ক কিন্তু দেখার মতো। ঝাউবাংলোর
রহস্যভেদ করা সম্ভবই হতো না যদি না ক্যাবলা বুদ্ধিমানের মতো সব কিছু বিচার করতো,
যদি না টেনিদা কদম্ব পাকড়াশি ওরফে জগবন্ধু চাকলাদারের মাফলারটা কেড়ে নিত, যদি না
হাবুল সেই মাফলারটাকে ঠিকমতো চিনতে পারতো, এবং সাতকড়ি সাঁতরাই যে অখ্যাত গোয়েন্দা
গল্প লেখক পুণ্ডরীক কুণ্ডু, সেটা হ্যাণ্ডবিল দেখে যদি না গোয়েন্দা গল্পের পোকা প্যালার
মাথায় আসতো। ওদের টিম ওয়ার্কেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয় যে- সাতকড়ি সাঁতরাই হলেন
অখ্যাত গোয়েন্দা গল্প লেখক পুণ্ডরীক কুণ্ডু, আর কদম্ব পাকড়াশি হলেন তার পাবলিশার
জগবন্ধু চাকলাদার, পুণ্ডরীকবাবুর বইয়ের কাটতি বাড়াতে যার মাথা থেকে একেবারে যাকে
বলে ‘সত্য ঘটনা অবলম্বনে’ গোয়েন্দা গল্প লেখার বুদ্ধি আসে- চারমূর্তিকে বোকা
বানিয়ে। জগবন্ধু যে দারুণ প্লট সাজিয়েছিলেন সেটা উপন্যাসের ঠাসবুননেই বোঝা যায়,
কিন্তু চারমূর্তির বুদ্ধির জন্য পুরো প্ল্যানটা ভেস্তে গেল। জানা গেল যে,
কাগামাছি, ঝুমুরলাল, কদম্ব, সব চরিত্রই কাল্পনিক, শুধু কুণ্ডুমশাই ওরফে পুণ্ডরীক
কুণ্ডুই সত্যি। তবে লেখকের নাম তো নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, তাই রহস্যের গল্পে হাসি
আসবে না এটা ভাবাই যায় না। তাই কাটামুণ্ডু বদলে যায় প্লাস্টিকের মুণ্ডুতে, চরম
ভূতের ভয়ের মধ্যেও সাতকড়ি মাঝরাতে ফরাসী
শোনাতে আসেন, গাছের ডালে কাঁচকলা বেঁধে রাখা হয় কিংবা কিডন্যাপিং এর জায়গায় কুকুরে
চিবানো চপ্পল, হুঁকো আর মুড়ো ঝাঁটা খুঁজে পাওয়া যায়। এছাড়া টেনিদার স্বকপোলকল্পিত
ফরাসী ভাষা( পুঁদিচ্চেরি, মেফিস্টোফিলিস) আর বচনামৃতগুলো তো আছেই। বকবক করলে যে
কুরুবক হয়, সেটা টেনিদা ছাড়া কেই বা জানে? তবে ওই কাটা মুণ্ডুর ব্যাপারটা আমার একদম ভাল লাগেনি (আসলে খুব ভয় লেগেছিল)। কিন্ত রহস্য-হাসি-কবিতা, সব মিলিয়ে জমজমাট 'ঝাউবাংলো রহস্য'। তাই
পড়ে না থাকলে আজই পড়ে ফেলা যাক।
পুনশ্চ-
লেখাটা পড়ে কেমন লাগল কমেন্ট করে জানাবেন কিন্তু।
Comments
Post a Comment