ডি-লা গ্র্যাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস- ইয়াক ইয়াক (তৃতীয় কিস্তি)


আজ আমি টেনিদার যে উপন্যাসটার কথা বলব সেটা একটু স্বল্প পরিচিত। মানে অতটাও বিখ্যাত নয়। কিন্তু ভাল করে পড়লে বোঝা যায় যে, এই উপন্যাসটিও প্রসাদগুণে এমন কিছু কম নয়। উপন্যাসটি হল- ‘কম্বল নিরুদ্দেশ’। না, না, কম্বল মানে কিন্তু শীতকালের পরম বন্ধু কম্বল নয়, এটি একটি অতীব শয়তান, শাখামৃগ- অবতার, উড়নচণ্ডী ছেলের নাম (আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন) ! এসব কথা অবশ্য আমি বলছি না, ওটা প্যালা, হাবুল আর ক্যাবলা আগেই বলে দিয়েছে। প্যালা অবশ্য আর এক কাঠি উপরে গিয়ে  কম্বলের শয়তানির উপমা দিয়ে ওকে কিঞ্জল্ক, ডিণ্ডিম, এমনকি সুপসুপা সমাস ( এগুলোর অর্থ কী কে জানে!)- ও বলেছে। অবশ্য উপন্যাসে কম্বলবাবুর যে কয়টি শয়তানির কথা পাওয়া যায়, সেগুলো রীতিমতো ‘এপিক’। কুকুরের কানে লাল পিঁপড়ে ছেড়ে দেওয়া, প্রণামের ছল করে পায়ে বিছুটি পাতা ঘষে দেওয়া, গরুর পিঠে পটকা ফাটানো- এমন শয়তানি কেবল উচ্চস্তরের শয়তানেরাই করতে পারে। তো কাহিনী শুরু হয় এ হেন শয়তান- শিরোমণি কম্বলের ‘নিরুদ্দেশ’ হওয়া নিয়ে। নিরুদ্দেশ হওয়ার কারণ হল ওর কুস্তিগির মাস্টারমশাই খগেন মাশ্চটকের শাসানি। অবশ্য ও নিরুদ্দেশ হওয়াতে সবাই খুশিই হয়েছিল, কিন্তু আমাদের টেনিদার যেচেপড়ে উপকার করতে যাওয়ার জন্য( প্যালা অবশ্য আমাদের বলেছে – ওর বেয়াড়া রকমের লম্বা নাকটা সব ব্যাপারে গলানোর জন্য)-ই এই উপন্যাসটা শুরু হল। কিন্তু এই উপকার করতে গিয়ে যে কেঁচো খুঁড়তে কেঊটে সাপ বেরোবে, তা চারমূর্তি তো দূর অস্ত, পাঠককুলও আঁচ করতে পারে নি। একটা বেয়াড়া রকমের সঙ্কেত লেখা কাগজ সম্বল (চাঁদ-চাঁদনি-চক্রধর। চন্দ্রকান্ত নাকেশ্বর...) করে ওরা কম্বলকে খুঁজতে বেরোয়। আর তারপরেই শুরু হয় একেবারে রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ। সঙ্কেত বলে বলে তদন্তে এগোনোর ব্যাপারটাই খুব মজার। আর তালঢ্যাঙা বিন্দেবন, খিটখিটে হলধর জানা,  কপালে আবওয়ালা চন্দ্রকান্ত, কুস্তিগির খগেন আর স্বয়ং কম্বল- চরিত্রগুলো যেন নিজগুণে সম্পূর্ণ একেবারে।  তবে যাদের কথা না বললে আর কিছুই বলা হয় না, তারা হল- বাবা বিটকেলানন্দ( বাপ রে কী নাম), বিক্রমসিংহ, খটমল, অবকাশরঞ্জিনী আর অবশ্যই মা নেংটীশ্বরী। মা নেংটীশ্বরীর পুণ্যকাহিনি পরে বলছি, আগে কিছু কথা জিজ্ঞেস করি। বাবা বিটকেলানন্দ যে একজন মস্ত সাধু অর্থাৎ সিদ্ধপুরুষের ( নাকি হাবুলের কথাই ঠিক- উনি একটি খাঁটি ভাজাপুরুষ!) নাম, একথা বিশ্বাস হয় তো? আর যদি বলি বিক্রমসিংহ আর খটমল নামের ভদ্রলোকদুটি আসলে দুটি ছারপোকা, আর অবকাশরঞ্জিনী –এই ভারিক্কি নামধারিণী ভদ্রমহিলাটি আসলে একটি নধর নিটোল বাদুড়,  এবং এরা সকলেই বাবা বিটকেলানন্দের পোষ্য, তাহলেও বিশ্বাস হবে তো? তবে কাহিনির মূল আকর্ষণ নিঃসন্দেহে মা নেংটীশ্বরী। ভগবানের অনেক রূপ আমরা মূর্তিতে দেখি। কিন্তু তিনি যে নেংটি ইঁদুর রূপেও পুজো নিতে পারেন, এবং ঠকবাজদের আরাধ্যা দেবী হতে পারেন- সেটা মনে হয় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ই দেখাতে পারেন। এরপর থেকে বিপদে আপদে এনার নাম নিয়ে দেখতে পারেন কিন্তু। কাহিনির ক্লাইম্যাক্স সিন হয় মহিষাদলে। এর এই কাহিনিতে টেনিদার হিরোর অ্যাকশন দারুণ। টেনিদাকে এমন অকুতোভয় হতে আর কোথাও দেখা যায় নি। খগেন মাশ্চটককে একা হাতে ঘায়েল করে টেনিদা সবার মন জিতে নেয়। আর সবচেয়ে যেটা মজার- সেটা হল চারমূর্তি কম্বলকে খুঁজতে গিয়ে  উলটে খগেনদের চোরাকারবারি টিমকে ধরিয়ে দেয়। আর এবারও বুদ্ধির জোগানদার ওই ক্যাবলা! কিন্তু মজা তো তখন পাওয়া যায় যখন এত দৌড়োদৌড়ির শেষে কম্বল আবিষ্কৃত হয় চিলেকোঠা থেকে। এমন একটা থ্রিলিং অভিযান মাঠে মারা যাওয়ায় চারমূর্তি দুঃখ পেয়েছিল বটে, কিন্তু পুলিশ তাদের পেটভরে খাইয়ে খুশি করে দিয়েছিল। আর হাবুলের ‘ভাউয়া ব্যাঙ’ থিওরি তো অনবদ্য। তার সঙ্গে আছে টেনিদার  বচনামৃত- চড় মেরে কান কানপুরে, নাক নাসিকে পাঠিয়ে দেওয়া- ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে সবশেষে এটা স্বীকার করতেই হয় যে, টেনিদার অন্য তিনটি বিখ্যাত উপন্যাসের চেয়ে এই উপন্যাসটিতে রহস্য রোমাঞ্চের বুনোট একটু কম। কিন্তু তা সত্ত্বেও বলা যায় যে- এটি টেনিদার অন্যতম অসাধারণ অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি। তাই এখনও পড়ে না থাকলে আজই পড়ে ফেলা হোক ‘কম্বল নিরুদ্দেশ’।

পুনশ্চ- লেখাটা পড়ে কেমন লাগল কমেন্ট করে জানাবেন কিন্তু। 


Comments

Popular posts from this blog

ডি লা গ্র্যাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস- ইয়াক ইয়াক (শেষ কিস্তি)

ডি লা গ্র্যাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস- ইয়াক ইয়াক

সাম্প্রতিক কাশ্মীরী ছোটগল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)