ডি-লা গ্র্যাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস- ইয়াক ইয়াক
“ পটলডাঙার আমরা কজন,
বিখ্যাত চার মূর্তিমান…“- মান্না দের গাওয়া এই গানটা মনে আছে? “ চারমূর্তি” সিনেমার
টাইটেল সং ছিল এটা। কী বললেন? চারমূর্তি সিনেমাটা কী নিয়ে? আচ্ছা, কয়েকটা সোজা প্রশ্ন।
পটলডাঙা জায়গাটার নাম শুনেছেন? সেখানকার চাটুজ্যেদের রোয়াকের কথাও নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন?
তাও যদি না চিনতে পারেন তো, প্যালাকে চিনতে পারছেন? হাবুল? আর ক্যাবলাকে? এতক্ষণে নিশ্চয়
বুঝতে পারছেন আমি কার কথা বলতে চাইছি শেষমেশ? আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি যার কথা বলতে চাইছি
তিনি অন্য কেউ নন, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের দ্য ওয়ান অ্যাণ্ড অনলি ‘পটলডাঙার
টেনিদা!!!’ চাটুজ্যেদের রোয়াকে তাঁর সভা, থুড়ি আড্ডা, আর শাগরেদবৃন্দ হল নিরীহ রোগাপটকা
প্যালা, ঢাকাইয়া বাঙাল হাবুল আর পড়াকু ছেলে ক্যাবলা (নাম শুনলেই মনে হয় একদম ভ্যাবলা!
কিন্তু সে যে কী, তা পড়লেই জানা যায়) টেনিদার গুণের শেষ নেই। ক্লাস টেনে মনুমেন্ট হয়ে বসে থাকে (অবশ্য লেখক নারায়ণ
গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের খবর দিয়েছেন যে- টেনিদা থার্ড ডিভিশনে হলেও পাশ করে কলেজে ঢুকতে
পেরেছে ), পরের মাথায় হাত বুলিয়ে খেতে তাঁর জুড়ি নেই, দমাদ্দম চাঁটি গাঁট্টা লাগিয়ে
দিতে একেবারে সিদ্ধহস্ত আর অ্যাকশনের সময় –একেবারে হিরো (শুধু ভূতে একটু ভয় পায় এই
যা), আর ওর মুখের কথা তো একেবারে প্রবাদ …… না, না, এসব কথা আমি বলছি না, প্যালা আগেই
বলে দিয়েছে। আমি বলছি অন্য কথা। টেনিদা সমগ্র আমার একটি প্রিয় বই। বইটা পড়ে বিস্তর
হেসেছি। এখনও হাসি। অনেকদিন আগে পড়েছি, কিন্তু সম্প্রতি আরো একবার পড়লাম- ‘টেনিদা সমগ্র’।
মানে গল্প আর উপন্যাসের কম্বো প্যাক। এতে রয়েছে ৫টি উপন্যাস, ৩৩টি
গল্প ও একটি নাটিকা। প্রিয় জিনিস আবার পড়ে কেমন লাগল, সেটাই এবার থেকে কিস্তিতে
কিস্তিতে জানাবো।
প্রথমে বড় থেকেই শুরু করা যাক- অর্থাৎ উপন্যাস থেকে। আজ টেনিদার যে উপন্যাসটি নিয়ে কথা বলব
সেটি হল “চারমূর্তি”। রহস্য রোমাঞ্চের মধ্যেও যে হাসির ফুলঝুরি থাকতে পারে, তার
জলজ্যান্ত প্রমাণ এই উপন্যাস। এই উপন্যাসের কাহিনী যখন শুরু হচ্ছে তখন চারমূর্তিকে
অল্পবয়সী গোত্রেই ফেলা যায়- তারা সবে স্কুল ফাইনাল দিয়েছে। তাদের ঝন্টিপাহাড়িতে
ছুটির বেড়ানো কিভাবে রহস্য কাহিনিতে পরিণত হল, তারই বর্ণনা এই উপন্যাস। এর
প্রত্যেকটা চরিত্র- সে ঝন্টুরামই হোক, মেসোমশাই হোক বা ঘুটঘুটানন্দ আর গজেশ্বর, কিংবা
শেঠ ঢুণ্ডুরাম- যাকে বলে একেবারে ইউনিক।
দারুণ লাগে মেসোমশাইয়ের গুলগল্প বা ‘গুল্পো’ (কোথায় যেন একটা পড়েছি)- মোষের ল্যাজ ধরে ঘোরানো, বাঘের ( আজ্ঞে
হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন) পিঠে পড়ে গিয়ে বাঘকে অজ্ঞান করা( সে জ্ঞান ফেরাতে স্মেলিং
সল্ট লেগেছিল কিন্তু)। আর ভূত নিয়ে বীরত্ব ফলাতে গিয়ে টেনিদার শেষকালে বেড়ালের চোখ
দেখে ভয় পাওয়ার দৃশ্যটি তো অনবদ্য। এর পরেই আসে রামগড় যাওয়ার ট্রেনে সেই বিখ্যাত ‘মোলাকাত’-
স্বামী ঘুটঘুটানন্দ, গজেশ্বর আর চারমূর্তি। আর যোগসর্পের হাঁড়ির কথা কে না জানে!
রসগোল্লার হাঁড়ির অমন বিখ্যাত ‘ছদ্মনাম’ সাহিত্যজগতে আর দুটি নেই। সাপ যে হরিনামও করে,
সেটা টেনিদা পড়েই প্রথম জেনেছিলাম। এটাও দারুণ লাগে যে, আমাদের টেনিদা কিন্তু
হাঁড়ি- রহস্য ভেদ করে ফেলেছিল। তবে এরজন্য যে গজেশ্বরের হাতে ওরা ছাতু হতে হতে
বেঁচে গেল, সেটাই আশার কথা। আর কিম্ভূতকিমাকার ‘ঝন্টুরাম’ কে দেখে ভূত ভেবে
চারমূর্তির উর্দ্ধশ্বাস দৌড়ের ঘটনাটা পড়ে পেটফাটা হাসি আসতে বাধ্য। এর সঙ্গে আছে
কোকিলের হার্ট ফেল করে দেওয়া টেনিদা ও বাকি তিনমূর্তির গান। কিন্তু, এরপরেই হাসির
সাথে মিশবে রোমাঞ্চের রস। ঝন্টিপাহাড়ির বাংলোয় মধ্যরাতের অশরীরী কাণ্ডকারখানা
এককথায় রোমহর্ষক। এই বর্ণনা যতটা হাসি জাগায়, ঠিক ততটাই ভয় জাগায়। তার পরেই শুরু
হয় চারমূর্তির আসল অভিযান। উপন্যাস পড়তে পড়তে যেটুকু ভয় জাগে, সেটুকু দূর হয়ে যায়
অনাবিল হাসির ছোঁয়ায়। দস্যু ঘচাং ফুঃ এর জবাব কেবল ‘নস্যু কচাং কুঃ’ ই হতে পারে। ঘন
বনের মধ্যে শেঠ ঢুণ্ডুরাম আর প্যালার মোলাকাত অসাধারণ। আর যে কথা না বললে কিছুই বলা হয় না, তা হল গজেশ্বরের অশ্রুতপূর্ব গান সহযোগে অভূতপূর্ব নৃত্য। সে
কত্থক ভাবলে কত্থক, মণিপুরি ভাবলে মণিপুরি আর তাড়কা নৃত্য বললে তাড়কা নৃত্য। আর
শেষপর্যন্ত চারমূর্তি তথা ক্যাবলার বুদ্ধির দৌলতে ঘুটঘুটানন্দের রহস্য ফাঁস হতে
দেখে ‘চারমূর্তি জিন্দাবাদ’ বলে জয়ধ্বনি দিতে ইচ্ছা করে। মানুষের মুখকে কচুঘণ্ট আর
সিঙাড়ার সঙ্গে তুলনা করতে বোধহয় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ই পারেন। আর টেনিদার মুখের বচনামৃতগুলো
তো উপন্যাসের সম্পদ। তবে মনে হয় ওই মাথার খুলি-টুলির বিষয়গুলো না আনলেই লেখক ভাল করতেন। কিন্তু সব মিলিয়ে হাসি আর রহস্যের অসাধারণ প্যাকেজ
উপন্যাসটি। তাই এখনও না পড়ে থাকলে আজই পড়ে ফেলা যাক ‘চারমূর্তি’।
পুনশ্চ: পড়ে কেমন লাগল কমেন্ট করে জানাবেন কিন্তু!
পুনশ্চ: পড়ে কেমন লাগল কমেন্ট করে জানাবেন কিন্তু!

Comments
Post a Comment