ডি লা গ্র্যাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস- ইয়াক ইয়াক ( গল্পের দ্বিতীয় কিস্তি)
আজ আমি আবার শোনাব নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘টেনিদা সমগ্র’ থেকে টেনিদার আরো ১১টি গল্প। আমি আপনাদের কাছে আবার ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, কারণ সত্যিই ব্লগ দিতে বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে। দেরি হলে সত্যিই ধৈর্য আর থাকে না। আর যারা আমার ব্লগ-এ নতুন, তাঁদের জন্য বলি, এই গল্পগুলোর কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ গল্প টেনিদার স্বকপোলকল্পিত, আর কিছু গল্প হল ঘটনার বিবরণ। আর টেনিদার বলা গল্পগুলো বেশির ভাগ তৈরি হয়েছে চারমূর্তির আদত ঠেক-এ, অর্থাৎ চাটুজ্যেদের রকে। আর বাকি গল্পের জন্ম অন্যান্য জায়গায়। কোনো কোনো গল্পে কিন্তু হাবুলের মুখে ঢাকাই ভাষা নয়, খাঁটি চলিত ভাষাই রয়েছে। আর কিছু কিছু গল্প টেনিদা বলেছে কেবল প্যালাকে আর অন্যান্য গল্পগুলো তিনজনকে একসাথেই বলেছে। আর হ্যাঁ, টেনিদার পেট থেকে গল্প বের করতে গেলে, ডালমুট, তেলেভাজা অর্থাৎ কিছু খাদ্যদ্রব্য ভেট দিতে হয় বইকি। আরেকটা কথা বলে দিই যেটা আগের ব্লগে বলি নি, সেটা হল প্রায় প্রতিটা গল্পেই টেনিদার কোনো না কোনো মামার উদাহরণ চলেই আসে। অনেক কথা বললাম। আর দেরি না করে শুরুই করে দিচ্ছি।
১) তত্ত্বাবধান
মানে-জীবে প্রেম-
আবার! আবার
সেই পরোপকারের ভূত! তবে এবার ‘পরের উপকার করিও না’ গল্পের মতো পাঁচন গেলানো নয়,
টেনিদা গেছে ফ্ল্যাট তত্ত্বাবধান করে পরোপকার করতে। ভোম্বলদা নামক এক ব্যক্তি ছুটি
কাটিয়ে বাড়ি আসার পূর্ব মুহূর্তে সে গেছে তাঁর ফ্ল্যাট সুপারভাইজ করতে, সাদা কথায়
সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না দেখে আসতে। সঙ্গে তার ‘পার্টনার ইন ক্রাইম’ প্যালারাম।
প্যালাকে অবশ্য চাচার হোটেলের কাটলেট খাওয়ানোর প্রমিস করে ম্যানেজ করতে হয়েছে।
কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা পরোপকার করার ‘উদগ্র বাসনায়’ সাজানো ফ্ল্যাটকে প্রথমে কার্পেট-ঝাড়া ধুলোয়
ভর্তি করে, তারপর ডিমভাজা করতে গিয়ে স্টোভ উলটিয়ে ঘরের পর্দায় আগুন ধরিয়ে এবং
শেষমেশ পচা জল দিয়ে পুরো ফ্ল্যাটকে স্নান করিয়ে দিয়ে কেমন দারুণ সুপারভাইজ করে
এসেছে, তার আসল স্বাদ কেবল গল্পটা পড়লেই জানা যাবে। তবে ভাগ্যিস ভোম্বলদা ঢুকতে ঢুকতেই ওরা চম্পট
দিতে পেরেছে, নইলে কী হত বলা যায় না। তবে দুজনের আনাড়ি আচরণ সারা গল্প জুড়েই দারুণ
উপভোগ্য। আর প্যালা তার হুলোবেড়ালের পেট আর ভোম্বলদার ভালোনাম নিয়ে যে দারুণ
চিন্তাগুলো করেছে, সেগুলো সত্যিই দারুণ।
২) দশাননচরিত-
এই
স্বকপোলকল্পিত গল্পটা টেনিদা বলেছে প্যালাকে।
প্যালার এক পকেটমারের ধরা পড়ার খবরের ভিত্তিতেই এই কাহিনির জন্ম। এই
দশাননের চরিতকথা আসলে এক পকেটমারের ( আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন) চরিতকথা। দশানন ছিল ঘুঁটেপাড়ার ( কী বিশ্রী নাম!) দাতাকর্ণ । কিন্তু প্রথম জীবনে সে ছিল একটি পকেটমার। যে সে পকেটমার নয়, একেবারে যাকে
বলে দুর্ধর্ষ- দুর্দান্ত পকেটমার ছিল এই দশানন। স্কুলের পণ্ডিতমশাই থেকে বাড়ির
গুরুদেব, কেউই তার কৃপাদৃষ্টি থেকে রক্ষা পেত না। কিন্তু লোকের শান্তির জন্য পুলিশ
কমিশনার প্যান্থার সাহেব যখন তাকে বাঘের পকেট কাটার হুকুম দিয়ে সুন্দরবনে ছেড়ে
দিল, সেটাই ছিল তার জীবনের টার্নিং পয়েণ্ট। এরপর সে কীভাবে সেখানের নবাবি ভূত
জবরদস্ত খাঁয়ের পকেট কেটে সেই টাকা দিয়ে
দানধ্যান করেছিল, সেটাই হল গল্প।
সত্যি, ভূতের পকেটও কাটা যায় তাহলে! সবমিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য গল্পটি। টেনিদার বলা
মাংসের দোকানদার মিস্টার চিকেনসন, জাপানি গাইয়ে তাকানাচি আর ফ্রান্সের সানাইওয়ালা
মিস্টার প্যাঁ কে কজনই বা চেনে? সব মিলিয়ে সুন্দর একটি গল্প।
৩) দি
গ্রেট ছাঁটাই-
গ্রেট মানে
সত্যিই গ্রেট। গল্পটা পড়ে আমি ঝাড়া পাঁচ মিনিট হাসি আর থামাতেই পারিনি। হুলোদার
বউভাতের নেমন্তন্নে অনিমন্ত্রিত টেনিদা নিমন্ত্রিত প্যালার সঙ্গে যেতে চাওয়ায়
প্যালা হুলোদার পালোয়ান বাবার ভয় দেখিয়ে তার আশায় জল ঢেলে দিয়েছিল। টেনিদা তার
প্রতিশোধ নিতে প্যালাকে এমন চুলের ছাঁট করে দিয়েছিল, যাতে তার নেমন্তন্ন খেতে
যাওয়াই বন্ধ হয়ে যায়। সেটাই হল গল্পের বিষয়। গল্পের মধ্যে টেনিদা এক একটি সেলুনের
নাম দেখে তার যে ব্যাখ্যা দিয়েছে সেগুলো সাবধানে পড়বেন, কারণ পড়লে হাসতে হাসতে
পেটের নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে যেতেই পারে। আর প্যালার অফিসের ছাঁটাইয়ের সঙ্গে চুল
ছাঁটাইকে গুলিয়ে ফেলা দারুণ। শেষকালে পরামানিকের কাছে গমন এবং পরামানিকের ক্ষমতায়
বিশ্বাস না করে টেনিদার নিজেরই কাঁচি হাতে অবতীর্ণ হওয়া আর তার অনিবার্য ফল হিসেবে
প্যালার বউভাতের নেমন্তন্ন খাওয়া একদম বরবাদ। একেবারে গ্রেট ছাঁটাই-ই বটে।
৪) ক্যামোফ্লেজ-
আমাদের
টেনিদা সবই করেছে। পৃথিবীর হেন কাজ নেই যা সে করে নি। এমনকি সে নাকি যুদ্ধেও গেছে।
তিন তিনটে ভিক্টোরিয়া ক্রসও নাকি ওর ঝুলিতে আছে। না, না, এসব কথা আমি বলছি না
কিন্তু, টেনিদাই বলেছে ক্যাবলা, হাবুল আর প্যালাকে। ‘ক্যামোফ্লেজ’ শব্দের মানে হল
ছদ্মবেশ। টেনিদা যখন নাকি টিড্ডিম নামে
একটা জায়গায় কম্যাণ্ডার হিসেবে জাপানিদের সঙ্গে লড়তে গিয়েছিল ( সবই টেনিদার উর্বর
মস্তিষ্কের ফসল) তখন সেই ক্যামোফ্লেজ তাকে
কীভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল, এটা তারই গল্প। যে সব গল্পগুলো বলে
টেনিদা বাকি তিনমূর্তি সুদ্ধ পাঠকদেরও একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ করে ছেড়েছে, এটা
সেগুলোর মধ্যে একটা। ঘুমিয়ে নাক ডাকতে ডাকতে জাপানি মারা, আরাকানের পাহাড়ে কাশীর ল্যাংড়া আমের খোঁজ
পাওয়া, আর কুকুরের ছদ্মবেশে জাপানিদের সঙ্গে চালাকি করার বিষয়গুলো একেবারে অনবদ্য।
তবে গল্পশেষে টেনিদা যেভাবে বাকিদের চমকে দেয়, তা সত্যিই অসাধারণ। আর
হ্যাঁ, এখানে কিন্তু হাবুলের মুখে ঢাকাই ভাষা নেই।
৫) কুট্টিমামার হাতের কাজ-
এই গল্পটা
টেনিদা প্যালাকে বলেছে বটে, কিন্তু এটা টেনিদার গল্প না। এটা টেনিদার সেই বিখ্যাত
কুট্টিমামা গজগোবিন্দ হালদারের গল্প। যার কি না ভূতের মতো চেহারা, আর অসম্ভব খেতে
পারার ক্ষমতা। চিড়িয়াখানায় নাকের লোম উঠে যাওয়া একটা ভালুককে দেখে টেনিদা প্যালাকে
বলে যে, এটাই হল সেই ভালুক যাকে কুট্টিমামা নাক পুড়িয়ে দিয়ে জব্দ করেছিল। কীভাবে?
সেটাই হল গল্প। এটাই কিন্তু টেনিদার কুট্টিমামা সম্পর্কে বলা প্রথম গল্প। আফিমের
ঝোঁকে ভালুককে চাকর রামভরসা বলে মনে করা, শুঁটকি মাছের পুঁটলি ধরানো, বকাবকি করা,
এবং শেষে রাতে অন্ধকারে চাঁদের আলোয় ভালুকের মুখ দেখা আর অনিবার্য ফলশ্রুতিতে ভয়
পেয়ে হাতে থাকা টিকের আগুন ভালুকের নাকে ছুঁড়ে মারা- এই ছিল ভালুকের সঙ্গে
কুট্টিমামার দুর্ধর্ষ মোলাকাত। কাহিনির ফাঁকে ফাঁকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত
বিদ্যাওয়ালা (তাও নাকি তিনবার ফেল!) কুট্টিমামার
নিদারুণ ইংরেজি বুলি (আই একটু বেশি ইট স্যার…..) শুনলে হাসতে
হাসতে পেটে খিল ধরা অনিবার্য। আর শুধুমাত্র খাওয়ার জন্য লোকে সাহেবদের কোম্পানিতে
চাকরি পেতে পারে, তা এই গল্পটা না পড়লে বোঝাই যেত না। আর কুট্টিমামার মুখে
রামপ্রসাদী গান বলে যে শ্যামাসঙ্গীত বসানো হয়েছে( নেচে নেচে আয় মা কালী…..) সেটা শুনলে স্বয়ং রামপ্রসাদ কী বলতেন কে জানে? সব মিলিয়ে অনবদ্য গল্পটি।
৬) সাংঘাতিক-
টেনিদা নিজে
যেমন জীবনে অনেক কিছু করেছে, তেমনই
টেনিদা- হাবুল -ক্যাবলা-প্যালা এই
চারমূর্তি মিলেও কিন্তু জীবনে অনেক কিছু কীর্তি করেছে। তাহলে সব কীর্তিই যখন করা
হল, তখন প্ল্যানচেট বা ভূত নামানোটাও বাকি থাকে কেন? তবে এটা যেন ভাববেন না যে ওরা
নিছক কৌতূহলবশতঃ প্ল্যানচেট করেছে। খুব ঠেকায় না পড়লে কেই বা ভূতেদের সঙ্গে কারবার
করতে চায় বলুন! ওদের সামনে ছিল ওদের সাক্ষাৎ যম- মানে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা। আর পাঠকমাত্রেই জানেন যে একমাত্র ক্যাবলা ছাড়া
আর বাকি তিনজন লেখাপড়ায় তেমন ‘ইয়ে’ নয়, মানে ভাল নয়। তাই অঙ্কের মতো ভয়ানক সাবজেক্ট
(অন্তত আমার কাছে তো তাই)- কে পার করার জন্য প্ল্যানচেটকেই তরণী বানিয়েছিল
ওরা। এমনকি সব ব্যবস্থা করে প্রয়াত অঙ্কের
মাস্টার হারু পণ্ডিতকে ডাকা শুরুও করে দিয়েছিল। কিন্তু শেষ অবধি এলেন
মার্জারপণ্ডিত, হারুপণ্ডিত নয়। কীভাবে এল, সেটাই হল গল্পের মজা। বিড়াল আর বালির বস্তার
ধাক্কায় প্ল্যানচেট ভেস্তে গেল। রহস্যময় পরিবেশে হাসির ঝলকানি দেওয়া এই গল্পটি অসাধারণ।
চারমূর্তিকে নাকাল হতে দেখে খুবই ভাল লাগে।
৭) বন-ভোজনের
ব্যাপার-
বনভোজন বা
পিকনিক করতে কার না ভাল লাগে? চারমূর্তিও তাই গিয়েছিল পিকনিক করতে। অনেক তাবড় তাবড়
মেনু বাদ দিয়ে তারা যখন একটা ছিমছাম খাবারের মেনু আর সেইমতো জিনিসপত্র নিয়ে
বনভোজনে গেল, কিন্তু সেইসব খাবার রান্না
হয়ে তাদের পেটে আদৌ গেল কি না, সেটাই হল গল্প। আসলে আসার পথে প্রায় সব খাবারই নষ্ট হয়েছিল। সে প্যালার
হাতে হাবুলের দিদিমার বানানো আচার হোক বা টেনিদার হাতে স্পঞ্জ রসগোল্লা কিংবা হাবুলের হাতে প্যালার ‘ছোট রাজহাঁসের ডিম’(
আসলে মুরগির ডিম)। আর শেষ খেল দেখালো টেনিদা। তার ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ‘কড়া’ পাহারা
দেওয়ার চোটে বানরবাহিনী এসে ওদেরই চালডাল দিয়ে বনভোজন করে নিল। তবে হ্যাঁ, শেষে ওদের জলপাই দিয়ে বনভোজন করতে
দেখে ভাল লাগে। আর বানরবাহিনীর সঙ্গে ওদের মোলাকাতের মুহূর্ত, ক্যাবলার পেয়াদার ঢঙে
খাবারের অন্তিম পরিণতি ঘোষণা আর প্যালার মাছ রান্নার বর্ণনা সত্যিই দারুণ।
৮) কুট্টিমামার
দন্ত-কাহিনী-
গজগোবিন্দ হালদারকে
মনে আছে? আরে টেনিদার সেই মামা, যে নাকি ভালুকের নাক পুড়িয়ে দিয়েছিল? তারই আরেকটা জবরদস্ত
কীর্তি হল এই গল্প। কুট্টিমামা অবশ্য তাঁর এই কীর্তিগুলো নিজের অজান্তেই করে ফেলেন।
টেনিদা এই গল্প শুনিয়েছে বাকি তিনমূর্তিকে। এই গল্পের বিষয় হল- কীভাবে টেনিদার কুট্টিমামার
দাঁত বাঁধানো হয়েছে, তারপর কীভাবে কুট্টিমামা বাঘ আসাতে গাছে উঠে ভয় পেয়ে কালী সিংহ
( কালীপ্রসন্ন সিংহ) –এর মহাভারত নীচে ফেলে বাঘের দুপাটি দাঁত ভেঙে দিয়েছে, তারপর সেই
বাঘ কী করে কুট্টিমামার বাঁধানো দাঁতই চুরি করে নিয়ে গেছে। কুট্টিমামার
সঙ্গে বাঘের মোলাকাতের অংশটি একেবারে চমকপ্রদ। মহাভারত যে বাঘের দাঁতও খুলে নিতে
পারে, সে কথাই বা কয়জন জানে? আর সেই বাঘ
যে মানুষের দাঁত নিজের মুখে ফিট করাতে পারে, সে কথাও অনেকে জানে না। মানুষের
পেস্ট-টুথব্রাশ নিয়ে বাঘের চম্পট দেওয়া বা আলুর দম আর মুলো ছেঁচকির প্রতি বাঘের
ভালবাসার কথা তো আরোই কেউ জানে না। টেনিদার কুট্টিমামা কিন্তু এসব নিজের চোখে
দেখেছেন। বাঘের কাণ্ড আর কুট্টিমামার ভুল ইংরেজিই গল্পকে জমিয়ে দিয়েছে একেবারে।
৯) প্রভাতসঙ্গীত-
নিজেদের
জিমন্যাস্টিক ক্লাবের জন্য টেনিদারা কীভাবে টাকা জোগাড় করল, তাও আবার ভোরবেলা
হরিসংকীর্তনের মতো গান গেয়ে- সেটাই হল এই গল্পের বিষয়। গল্পে প্যালা ভীম আর হনুমানকে
নিয়ে যা একখানা গান লিখেছে( জাগো রে নগরবাসী, ভজো হনুমান...) তা তামাম দুনিয়ার
পালোয়ানদের জাতীয় সঙ্গীত হতেই পারে। আর ওদের গানের গলা যে তথৈবচ, সেটা ঘোষবাড়ির
মাসিমার চিৎকার আর গজকেষ্ট হালদারের বাড়ির বারান্দা থেকে প্রথমে ফুলের টব, জলের
কুঁজো আর শেষে একটা আস্ত বিড়াল পড়তে দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু ওদের বাঁচালেন বিধুবাবু। অমন পাড়া
কাঁপানো গানের জন্যই তাঁর ঘুম ভেঙে গেল,
আর ট্রেন মিস না করায় তাঁর কন্ট্রাক্ট ও বাঁচল। বিধুবাবুর জন্য টেনিদাদের ক্লাবও
বাঁচল। ভোর বেলায় টেনিদাদের এই গান অভিযান সত্যিই অপূর্ব। আর তাদের উপর হামলাগুলো
একটুর জন্য মিস হওয়ায় পাঠককুল হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। আর প্যালা টেনিদার গানের যে উদাহরণ
দিয়েছে, তা তুলনাহীন।
১০) ভজহরি
ফিল্ম কর্পোরেশন-
এর মানে হল
ফিল্ম কোম্পানি। এই প্ল্যানের স্রষ্টা এবং ধারক-বাহক হল টেনিদা আর প্যালা। হাবুল –ক্যাবলা
এতে নেই। ভীমনাগের সন্দেশ খাওয়ার জন্য টাকা ধার দিতে প্যালার আপত্তি এবং সেই কারণে দুঃখিত হয়ে টেনিদার বড়লোক হওয়ার
বাসনাতে ফিল্ম কোম্পানির ব্যবসা শুরু করা- এই হল গল্পের শুরু। সহজে বড়লোক হতে লোকে কী না করে। টেনিদা আর তার ‘পার্টনার
ইন ক্রাইম’ প্যালা তাই ফিল্মে চান্স করে দেওয়ার নামে শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করল। সবাই
ওদের থেকে চান্সের আশায় শেয়ার কিনলো, টেনিদার বড়লোক হওয়ার আশাও মিটল। কিন্তু দেশের
লোক যে বুরবক নয়, সেটা ওরা কীভাবে টের পেল, সেটাই হল গল্পের ক্লাইম্যাক্স। টেনিদার উপস্থিত বুদ্ধির তারিফ কিন্তু করতেই হয়।
যেভাবে ও চান্সপ্রার্থী মারমুখী জনতার হাত থেকে প্যালাকে নিয়ে পালিয়েছে, তা খুব কম
লোকেই পারে। কিন্তু ব্যবসা করা যে কী ঝামেলা, তা ওরা টের পেয়েছে। ছোকরা চাকর, বাড়ির ঝি, উড়ে ঠাকুর প্রমুখের মুখের
বিভিন্ন ভাষায় কথা, গল্পটিকে একটি সুন্দর রূপ দিয়েছে।
১১) চামচিকে
আর টিকিট চেকার-
আচ্ছা,
চামচিকের ইংরেজি কী, জানেন? আমি তো জানি
না। টেনিদা, হাবুল, ক্যাবলা-প্যালা অনেক চেষ্টা করেছে বটে, কিন্তু আসল ইংরেজি
কিছুতেই খুঁজে পায় নি। তবে এতো কিছুই নয়, এই একটা চামচিকে কীভাবে টেনিদাকে এক
সাহেব টিকিটচেকারের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল, সেটাই হল গল্প। মামার চেকার বন্ধুর ভরসায়
বিনাটিকিটে রেলযাত্রা করে সে যখন নতুন সাহেব চেকার ‘মিস্টার রাইনোসোরাস’( মানে কী
শ্রীযুক্ত গণ্ডার?) এর পাল্লায় পড়ল, তখন
একটা চামচিকে দেখে সাহেব ভেবড়ে গেলে সেই মুহূর্তের পুরো ফায়দা উঠিয়ে টেনিদা কেমন
করে তাঁকে জব্দ করল, এই গল্প পড়লে হাসি আসবেই। আর চারমূর্তি মিলে চামচিকের যে সব
ইংরেজি নাম বের করেছে( স্মল ব্যাট, ব্যাটলেট ইত্যাদি), তেমনটা আর কোথাও নেই। সাহেবের
চোস্ত ইংরেজি, চামচিকে কে পাখি বলে মনে করা, আর চামচিকের ভয়ে সাহেবের স্বভাব
পরিবর্তন , টেনিদার হিন্দি- সবকিছু মিলিয়ে
দারুণ একটি গল্প। আর হ্যাঁ, এখানে কিন্তু হাবুল বিশুদ্ধ ঢাকাই ভাষায় কথা বলেছে।
(চলবে)
পুনশ্চ-
লেখাটা পড়ে কেমন লাগল কমেন্ট করে জানাবেন কিন্তু।
Comments
Post a Comment