ডি-লা গ্র্যাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস- ইয়াক ইয়াক (পঞ্চম কিস্তি)


আজ আমি নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়েরটেনিদা সমগ্রথেকে যে উপন্যাসটির কথা বলব, সেটিকে উপন্যাস না বলে বরং বড়গল্পই বলা উচিত। কারণ টেনিদা সমগ্র-তে পড়ার আগে অন্য যে বইতে আমি কাহিনিটি পড়ি, সেখানে কাহিনিটি কিন্তু গল্প হিসেবেই ছিল। কিন্তু টেনিদা সমগ্র-তে এটিকে যেহেতু উপন্যাস হিসেবেই গণ্য করা হয়েছে, তাই আমিও এটিকে উপন্যাস হিসেবেই ধরছি। উপন্যাসটির নাম হল- ‘টেনিদা আর সিন্ধুঘোটক’না, না, নামটা পরে আবার যেন ভাববেন না যে, টেনিদার সঙ্গে সামুদ্রিক সী-হর্সের মোলাকাত হয়েছিল। সিন্ধুঘোটক হল একজন ব্যক্তির নাম। কে সেই ব্যক্তি? বলছি একটু পরে। সন্ধ্যাবেলা গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে গিয়ে টেনিদা আর প্যালা কীভাবে কিডন্যাপড হয়ে গিয়ে দুই পরিচালক ও এক অভিনেতার রেষারেষির মধ্যে পড়ে যায়, তাদেরকে ছদ্মবেশ পরিয়ে একটা নস্যির কৌটো (আজ্ঞে হ্যাঁ, সামান্য একটি নস্যির কৌটো) চুরি করতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, সেটাই এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু  এই উপন্যাসে কিন্তু ক্যাবলা আর হাবুল অনুপস্থিত। কিন্তু তা বলে কুশীলবের অভাব নেই- আছেন অবলাকান্ত, ঘেঁটুদা, ফিল্মস্টার বিজয়কুমার, পরিচালক গজানন মাইতি, আর সিন্ধুঘোটক? এই স্বনামধন্য ব্যক্তিটি হলেন পরিচালক হরিকিঙ্কর ভড় চৌধুরী। এমন উদ্ভট নাম তার কিভাবে হল, সে কথা ক্রমশ প্রকাশ্য। টেনিদা আর প্যালা গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে বসেছিল, দুজন অজ্ঞাতকুলশীল ব্যক্তি- অবলাকান্ত আর ঘেঁটুদা এসে ‘খেলনা’ পিস্তল দেখিয়ে ( আজ্ঞে হ্যাঁ, সেটা পরে বোঝা গিয়েছিল) তাদের প্রায় হাইজ্যাক করেই নিয়ে যায় ‘জয় মা তারা’ স্টুডিও তে। খেলনা পিস্তলের কারসাজিটা যদিও টেনিদা আর প্যালা  বুঝতে পারেনি। ভাগ্যিস পারেনি, তা না হলে এত সুন্দর একটা গল্প তৈরি হত কী? আর কেন নিয়ে গেছিল? টেনিদার অমন একটা ‘সিগনেচার’- মার্কা চেহারা দেখে তাদের ধারণা হয়েছিল,  তারা যাকে খুঁজছে অর্থাৎ ফিল্মস্টার বিজয়কুমারের খাস চাকর কম্বলরাম( এমন নামের মানুষও থাকে), টেনিদাই হচ্ছে সে। তাহলে বুঝতে হবে যে,  টেনিদার মতো অমন চেহারাও কারোর থাকে। অতএব, নিয়ে চল তাদের সিন্ধুঘোটকের ডেরায়! সিন্ধুঘোটকের চেহারার যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তেমন চেহারার জুড়ি আর কোথাও আছে কি না সন্দেহ। ব্যাঙের ডাকের মতো যদি কারো গলার আওয়াজ হয়, আর তার সঙ্গে উপরি পাওনা হিসেবে  তিন পোঁচ আলকাতরা মাখা গায়ের রঙ হয়, তাহলে সে মানুষকে কেমন দেখতে, আপনারা মানসনেত্রে দেখে নিন। কিন্তু টেনিদা যে কম্বলরাম, ডেরায় আসার পর  সে ভুল ভেঙে গেল।  কারণ, যতই কম্বলরামের মতো চেহারা হোক, টেনিদা তো আর কম্বলরাম নয়, তাই কম্বলরামের সিগনেচার সাইন যে জড়ুল, তা টেনিদাতে নেই। কিন্তু, কুছ পরোয়া নেহি, মেক-আপ আছে কী করতে? মেক আপের জাদুতে টেনিদা হয়ে গেল কম্বলরাম, আর প্যালার অবশ্য কিছু হওয়ার দরকার ছিল না, কিন্তু মেক আপ ম্যান আর হাত মকশো করার লোভ সামলাতে না পারায় প্যালা হয়ে গেল কাঁথারাম( কী সাংঘাতিক নাম) বা ওর নিজের ভাষায় ন্যাদাপাগলা! 

এর পর শুরু হয় অভিযান। ঘুটঘুটে অন্ধকারে জয় মা তারা স্টুডিও-র রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা সত্যিই দারুণ। টেনিদা যেভাবে  কারোর সাহায্য ছাড়াই একেবারে নিজের বুদ্ধিতে রহস্যজাল কেটে বেরিয়ে এসেছে, তা সত্যিই তারিফ করার মতো। বিজয়কুমারের নস্যির কৌটো গায়েব করলেও ততটা কার্যসিদ্ধি হত না, যতটা হয়েছে টেনিদা বিজয়কুমারকে সত্যিটা ফাঁস করে দেওয়াতে।  কিন্তু চমক তখনই লাগে যখন অবলাকান্ত ট্যাক্সি ড্রাইভার সেজে পলায়নরত টেনিদা আর প্যালাকে পটলডাঙায় ছেড়ে দিয়ে আসে। রহস্যের প্রি-প্ল্যানিং ব্যাপারটা এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায়। টেনিদা আর প্যালার কাছে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয় পরের দিন সকালে, যখন স্বয়ং  সিন্ধুঘোটক ওরফে পরিচালক হরিকিঙ্কর ভড় চৌধুরী তাদের কাছে ব্যাপার খোলসা করেন। সিনেমার নায়ক করার জন্য বিজয়কুমারকে নিয়ে পরিচালক গজানন মাইতি আর হরিকিঙ্করের টানাটানিতে তুরুপের তাস ছিল বিজয়কুমারের ‘পুরাতন ভৃত্য’ কম্বলরাম। হরিকিঙ্কর চেয়েছিলেন  কম্বলরামকে দিয়েই গজাননের ছবির শ্যুটিং পণ্ড করে দিতে। কিন্তু সে যখন বেড়াতে গেছে, তার প্রক্সি হিসেবে টেনিদাই হয়ে গেল তুরুপের তাস। আর পটলডাঙার হিরো টেনিদাকে খুঁজে বের করা এমন কী কঠিন? একেই বোধহয় বলে ‘খ্যাতির বিড়ম্বনা’! প্যালার জবানিতে শ্যুটিং ফ্লোরের বর্ণনা যেন নতুন এক অভিজ্ঞতা। আর সিন্ধুঘোটক নামের রহস্য? গজানন মাইতিকেই লোকে আড়ালে -আবডালে বলে সিন্ধুঘোটক। আর নস্যির কৌটোই বা কেন? ছেলেবেলা থেকে নস্যি নিতে অভ্যস্ত বিজয়কুমার নস্যির কারণে মাস্টারের কাছে মার খাওয়ার পর থেকেই নস্যির কৌটো শব্দবন্ধকে অপয়া ভাবতে শুরু করেন। ঠিক যেমনটি গজানন মনে করেন সিন্ধুঘোটক নামটির বিষয়ে।  তাহলে কী হল?  টেনিদা সত্যি কথা বলে উলটে হরিকিঙ্করেরই সুবিধা করে দিয়ে এল। রহস্যের বুনোট শেষ অবধি টানটান থাকে বলেই উপন্যাসটি পড়তে ভাল লাগে। আর এত ঝুঁকি নেওয়ায় টেনিদা আর প্যালা গিফট পেয়েছে দেখেও আমরা, আপামর পাঠককুল আনন্দিত হই। অবলাকান্ত, ঘেঁটুদা সব চরিত্রই খুব সুন্দর। তবে অন্যতম সেরা মনে হয় সিন্ধুঘোটককে। হাসি আর রহস্য রোমাঞ্চে ভরা সুন্দর উপন্যাস ‘টেনিদা আর সিন্ধুঘোটক’। তাই এখনও পড়ে না থাকলে আজই পড়ে ফেলা যাক।

(আজ উপন্যাসের কিস্তি শেষ। কাল হবে গল্পের কিস্তি)   

পুনশ্চ- লেখাটা পড়ে কেমন লাগল কমেন্ট করে জানাবেন কিন্তু।


Comments

Popular posts from this blog

ডি লা গ্র্যাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস- ইয়াক ইয়াক (শেষ কিস্তি)

ডি লা গ্র্যাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস- ইয়াক ইয়াক

সাম্প্রতিক কাশ্মীরী ছোটগল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)